cbn  

–  শ্রীধর দত্ত

সংগীত হচ্ছে মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন। সুরহীন হৃদয় মৃত ব্যক্তি তুল্য। মানুষ গানের মাধ্যমে নিজেদের সুখ ,দুঃখ ও বেদনার কথা প্রকাশ করতে পারে। গানের মধ্যে নিজ জীবনের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে। স্বাধীনতার পূর্বে ও তৎপরবর্তী কিছু সময়কে বাংলা গানের স্বর্ণালী যুগ বলা হয়। সেই স্বর্ণালী যুগের গান, গানের কথা, সুর হাজার বছর বেঁচে থাকবে। সেই যুগের কীর্তিমান সঙ্গীত শিল্পী কোকিল কন্ঠি সুবীর নন্দী। আশি ও নব্বই দশকের সময় তাঁর গান আবাল ,বৃদ্ধ, বনিতা সবার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। তিনি বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী। তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ ফুসফুস, কিডনি ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে সি এম এইচ হাসপাতাল ও সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ ই মে প্রয়াত হন। সুবীর নন্দীর দেহের মৃত্যু হয়েছে , কিন্তু উনার সৃষ্টিকর্ম গানের সুরের মাধ্যমে তিনি আমাদের হৃদয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকবেন। তিনি অনেক সংগীত- শিল্পীর শিক্ষাগুরু। তাঁর প্রতিটি গান মাটি ও মানুষের হৃদয় ছোঁয়া। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন নম্র ও ভদ্র। এক কথায় মাটির মানুষ।

সুবীর নন্দী ১৯ শে নভেম্বর ১৯৫৩ সালে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দীপাড়া নামক এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসকও সঙ্গীতপ্রেমী। বাবার চাকরিসূত্রে তাঁর শৈশবকাল কাটে চা বাগানে । চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি বিদ্যালয় ছিল, সেখানে তিনি পড়াশোনা করেন। তবে পড়াশোনা যদি অধিকাংশ সময় তার কেটেছে হবিগঞ্জে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছ থেকে। তবে সঙ্গীতে তাঁর হাতে খড়ি মা পুতুল রানী কাছে। তিনি লেখাপড়া করেছেন হবিগঞ্জ গভমেন্ট হাই স্কুল এবং পরবর্তী হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে।

সুবীর নন্দী ১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণীর গায়ক ছিলেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারের গান করেন। তাঁর ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানের গুরু ছিলেন বিদিত লাল দাস। সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং মধ্য দিয়ে। প্রথম গান “যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়”- এর গীত রচনা করেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত “সূর্যগ্রহণ” চলচ্চিত্রে। ১৯৭৮ সালে আজিজুর রহমান পরিচালিত “অশিক্ষিত” চলচ্চিত্র রাজ্জাকের ঠোঁটে তাঁর গাওয়া “মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই” গানটি জনপ্রিয়তা এনেদে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম গতকাল সুবীর নন্দীর গান ডিস্কো রেকর্ডিং বাজারে আসে। ৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ার জীবনে আড়াই হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্র গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ব্যাংকে দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন।

সুবীর নন্দী চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ৫ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। সেগুলো হচ্ছে মহানায়ক -১৯৮৪, শুভদা -১৯৮৬, শ্রাবণ মেঘের দিন -১৯৯৯, মেঘের পরে মেঘ-২০০৪ ও মহুয়া সুন্দরী -২০১৫। সঙ্গীতে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১৯ সালে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করেন। সুবীর নন্দীর জনপ্রিয় গান গুলোর মধ্যে “দিন যায় কথা থাকে”, “আমার এই দুটি চোখ পাথর তো নয়”, “পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই”, “আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি”, “হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে”, “তুমি এমনি জাল পেতেছ”, “বন্ধু হতে চেয়ে তোমায়”, “কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো”, “পাহাড়ের কান্না দেখে”, “কেন ভালবাসা হারিয়ে যায়”, “একটা ছিল সোনার কন্যা”, “ও আমার উড়াল পঙ্খীরে”,”পাখিরে তুই দূরে থাকলে”। ১৯৮১ সালে তাঁর প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম” সুবীর নন্দীর গান”। এছাড়া তাঁর অন্যান্য অ্যালবামগুলো হল “প্রেম বলে কিছু নেই”, “ভালোবাসা কখনো মরে না”, “সুরের ভুবনে” গানের সুরে আমায় পাবে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় এবং ভক্তিমূলক প্রণামাঞ্জলী।

স্বর্ণালী দিনের সঙ্গীত শিল্পীরা একে একে না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন। তাঁরা হচ্ছেন ২০১৪ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগম। ২০১৭ সালের ২১ শে এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধা ও সংগীত শিল্পী লাকী আখন্দ। ৬ই মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা ও খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞ মিহির নন্দী। ২৭ শে জুন বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী স্বরলিপিকার ও নজরুল গবেষক সুধীন দাশ। ৩০শে আগস্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বহু জনপ্রিয় গানের বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার। এবং ঐ বছরের শেষে ২৪ শে নভেম্বর জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও নন্দিত বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী। ২০১৮ সালের ৬ই জানুয়ারি ঢাকাই সিনেমার অসংখ্য গানের জনপ্রিয় শিল্পী শাম্মী আক্তার। ১৮ই অক্টোবর গায়ক, লিডগিটারিস্ট, গীতিকার সুরকার প্লেব্যাক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। ২০১৯ সালের ২২ শে জানুয়ারি বরেণ্য গীতিকার সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ২৩শে মার্চ দেশের সুপরিচিত সংগীত শিল্পী শাহনাজ রহমত উল্লাহ। সবশেষে হারালাম “আমায় আর কান্নার ভয় দেখিয়ে লাভ নেই” সবাইকে কাঁদিয়ে দেশবরেণ্য জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীকে। একে একে বাংলা গানের উত্তরসূরী আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সংগীতাঙ্গনের জন্য এ এক বিরাট ক্ষতি। আমরা সব দেশবরেণ্য গুণীশিল্পীদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। তাঁদের সৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গন আজ সমৃদ্ধশালী হয়েছে। সুবীর নন্দীর গান বাংলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকবে আমার বিশ্বাস।

 


শ্রীধর দত্ত,পটিয়া, চট্টগ্রাম।
সানাইয়া, আল -আইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •