শাহীন মাহমুদ রাসেল
একজন শ্রমিকের গল্প কে ভালো জানে? যে শ্রমিকের ঘামে গড়ে ওঠে অট্টালিকা, কল-কারখানার সাথে ঘোরে দেশের অর্থনীতির চাকা। সেই শ্রমিকের জীবনমানের খবর কেউ রাখে না। একজন শ্রমিক কী খেয়ে, কোথায় ঘুমিয়ে, কী পোশাক-আশাকে, কোন পরিবেশে কতটা জীবনঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। কত টাকা উপার্জন করে, কিভাবে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন পরিচালনা করছে সে খবরও তো কেউ রাখে না?
একজন রেলশ্রমিক, মিলশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক অথবা গার্মেন্টস শ্রমিক তার মেহনতের স্বল্প উপার্জন দিয়ে জীবনটা কোনরকমে চালিয়ে নেয় আর কেবল স্বপ্ন দেখে। একটু বেশি শ্রম বিক্রি করে সন্তান লালন-পালন করে। অনেকে আবার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াও করায়, এই ভেবে যে তার সন্তানকে অন্তত যেন এই কঠিন কায়িক শ্রম বেচে খেতে না হয়। যে চাওয়া শুধু একটু ভালো থাকার জন্য। জীবনে একটু ঘুরে দাঁড়াবার জন্য। শ্রম বেচা এসব মানুষ শিক্ষিত সমাজের অথবা রাজনীতির মাঠের মারপ্যাঁচ বোঝে না। তারা ওসব নিয়ে এতো ঘাটতেও খুব একটা যায় না।
কিন্তু সেই শ্রমিককেই এই সমাজে বিভিন্নভাবেই ঠকানো হয়। তাদের শ্রমের সঠিকমূল্য দেয়া হয়না। স্বল্পমূল্যে এই দেশে শ্রমিক পাওয়া যায় তাই মালিকশ্রেণী তাদের প্রাপ্য অধিকার নিয়েও ভাবে না। শ্রমিককে এখানে প্রতিনিয়তই অসম্মান করা হয়। তাই হয়তো হাজার শ্রমিক হত্যার বিচারও সহজে এগোয় না। তা না হলে রানাপ্লাজা দুর্ঘটনা নামক হত্যাকণ্ডের জন্য তো দিবসের বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা।
ইংরেজি বছরের পঞ্চম মাসের নাম ‘মে’। ১৮৮৬ সালের এই দিনে শিকাগোর হে মার্কেটের সামনে শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১১ জন। নিহত সেইসব শ্রমিকের আত্মত্যাগের স্মরণে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে দিনটিকে ‘মে দিবস অথবা শ্রমিক অধিকার আদায়ের দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওইসব দেশে মাত্র ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুকেও বিশেষভাবে সম্মান জানানো হয়, গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এই দেশে রানাপ্লাজায় পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়া শ্রমিকদের জন্য কোনো বিশেষ দিবস ঘোষনা তো দূরের কথা, একসঙ্গে ‘১১শত’ শ্রমিক হত্যার বিচার নিয়েই তো টালবাহানা হয়!
মে দিবসে মিল-ফ্যাক্টরির মালিকশ্রেণী থেকে শুরু করে অনেকেই এই মহান দিবসের অনুষ্ঠানে বরাবরের মতো গলাছেড়ে বক্তৃতা দেন। বরাবরের মতোই শ্রমিক অধিকার আদায় করে দেয়ার আশ্বাসের বুলিও আওড়ে পরে আর বোধহয় তাদের আর সেসব মনে থাকে না। নইলে রানা প্লাজার শ্রমিকদের নিহত হবার পাঁচবছরে তাদের স্বার্থে কি কি করা গেছে? কেমন আছে আহত আর নিহতের পরিবার? কিভাবে চলছে তাদের জীবন? রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডের আসামি রানার খবর কি? এতগুলো প্রাণ কেড়ে নেবার দায়ে তার কি সাজা হলো? অথবা জাহাজশিল্পে কাজ করতে গিয়ে পা হারানো শ্রমিকের খবর কি? কি ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে তাকে? তার কোন কোন ক্ষতিরপূরণ হলো? শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কি কি অধিকার এনে দিচ্ছে রক্ত বেচে চাল কিনে খাওয়া এসব শ্রমিকদের?
কিছুই হয়নি। শ্রমিকনেতা বড় নেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। বড় নেতারা আরো বড়। কে খোঁজ রাখছে সমাজের এসব নিম্নবিত্ত শ্রমিক স্বার্থের? উন্নতি শ্রমিকের কখনোই হয়ে ওঠে না, উন্নতি হয় কেবল উঁচুতলার ওই কমমূল্যে শ্রম কেনা শিক্ষিত আর চালু মালিকদেরই।
সারাবছরে নানাভাবে নির্যাতিত, শোষিত, অবহেলিত এই শ্রমিকশ্রেণিকে নিয়ে রাজনীতি তো কম হয় না। নোংরা রাজনীতিতে পিষ্ট হয়ে শ্রমিক তার অধিকারটুকুও পায়না! বিএনপির শ্রমিকদল অথবা আওয়ামী লীগের শ্রমিকলীগ কোন দলকেই তো শ্রমিকের ভাগ্য ফেরাতে জোর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।
পয়লা মে আসলেই যেন শ্রমিকদের প্রতি বিশ্ববাসীর সাথে সাথে আমাদের এখানকার বণিকদেরও দরদ উথলে ওঠে। একদিনের স্পেশাল দরদ যাকে বলে আর কি। এইদিনে শ্রমিকনেতা অথবা মালিকশ্রেণি যেন শ্রমিকবান্ধব হয়ে ওঠে। শ্রমিকনেতাদের রক্ত গরম করা বক্তব্য আর কাজ বন্ধ রেখে দিবস পালন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় মহান মে দিবস! কিন্তু মহান মে দিবসে ঘোরেনা বা বলা ভালো ঘুরতে দেওয়া হয় না শুধু শ্রমিকের ভাগ্যের চাকা। এবারের মে দিবস হয়ে উঠুক শ্রমিকবান্ধব আর শ্রমিকের জন্য, শ্রমিক অধিকার আদায়ের জন্য। শ্রমিকের সম্মান আদায়ের জন্য। কর্মস্থলে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য। এবারের মে দিবসের অর্জন হোক রক্ত ঘাম করা পরিশ্রমি শ্রমিকের সঠিক ও ন্যায্য মূল্য পাবার জন্য। জয় হোক সকল শ্রমজীবী মানুষের। একজন শ্রমিকের সন্তানের পক্ষ থেকে সেই প্রত্যাশা।
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •