ইমাম খাইর, সিবিএন:
চিকিৎসাসেবায় অবহেলা, রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম, রোগি ও স্বজনদের সাথে ইন্টার্নী চিকিৎসকদের বিরূপ আচরণসহ নানা অভিযোগ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে কিছু ইন্টার্নী চিকিৎসকের অমানবিক আচরণে মোটেও সন্তুষ্ট নয় রোগি ও স্বজনেরা। তাদের কারণে সরকারী সেবাদানকারী গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের বদনাম হচ্ছে। এসব অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে উদ্যোগী হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে বেশ কিছু পদে। আরো পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিনে কর্মরতদের সেবাদানে যাতে কোন অভিযোগ না ওঠে- সেজন্য কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে বিভাগভিত্তিক তদারকি। সব মিলিয়ে জেলার ২৫ লাখ জনগণের এই হাসপাতালকে আরো বেশী জনগণের সেবামুখি করার পরিকল্পনা নিয়েছে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল) দুপুরে কক্সবাজার উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের একটি টীম হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। তারা হাসপাতালের বেশ কয়েকজন রোগি ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। শুনেন অভাব, অভিযোগের কথা। টিমটি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মহিউদ্দিনের চেম্বারে গিয়ে সঙ্গে সাক্ষাত করেন। উভয়পক্ষে হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা, সেবার মান ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা হয়।
সাক্ষাত শেষে বেরিয়ে এসে হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সম্মুখে দাঁড়িয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্যে ব্রিফ দেন কক্সবাজার উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি জাপা নেতা রুহুল আমিন সিকদার।
তিনি বলেন, আমরা হাসপাতাল ঘুরে দেখেছি। সুপারের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি হাসপাতালে ওষুধ ও খাবার সরবরাহে যাতে অভিযোগ না ওঠে, সে বিষয়ে নিজেই সার্বক্ষণিক তদারকি এবং হাসপাতালকে আরো বেশী সেবাবান্ধব করার কথা দিয়েছেন। আমরা বিভিন্ন অনিয়ম, অভিযোগের কথা তুলে ধরেছি। সব বিষয় তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। হাসপাতালকে অভিযোগমুক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন। আগামী সপ্তাহে আমরা আবার হাসপাতাল পরিদর্শনে যাব।
কথা বলেন কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও সংগ্রাম পরিষদের উপদেষ্টা আবু জাফর ছিদ্দিকী। তিনি বলেন, কিছু মাস্তান প্রকৃতির ডাক্তারদের কারনে ৫ দিন যাবৎ জেলা সদরের একমাত্র সরকারি হাসপাতালে জনসাধারণের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে ইন্টার্ন চিকিৎসকগণ চরম অন্যায় করেছিল। অথচ চিকিৎসা সেবা পাওয়া সকল মানুষের মৌলিক অধিকার।
তাছাড়া, চিকিৎসকদের ধর্মঘট করার কোন আইনগত অধিকার নেই। ধর্মঘট করে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা মানুষের শুধু মৌলিক অধিকার হরণ করেনি, জেলাবাসীর সাথে চরম উদ্ধত্য দেখিয়েছে। তাদের এ স্পর্ধা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় দৈনিক আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার সহসম্পাদক সাদেক রহমান, বাংলাদেশ মঙ্গল পার্টির চেয়ারম্যান জগদীশ বড়–য়া পার্থ, শহীদুল্লাহ মেম্বার, জহির আলম কাজল, সালেহ আহমদ, আবুল হোসেন, নুরুল ইসলাম ভূট্টো, জাহাঙ্গীর হোসেন, তাজুল ইসলাম, মাওলানা আজিজুল হক সিদ্দিকী, হাফেজ জাকের হোসাইন, সাইফুল ইসলাম, নুরুল হায়দার, মোহাম্মদ উল্লাহ, ইবনে হাসান রিফাত, জামাল হোসাইন প্রমুখ।
সুত্র মতে, পেটে ব্যথা নিয়ে ২ এপ্রিল কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি হন আনোয়ার নামে শহরের সমিতি পাড়ার এক বাসিন্দা। গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। চিকিৎসকরা একটি ইনজেকশন দেয়ার পরই আনোয়ারের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ রোগির স্বজনদের।
এরপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সহায়তায় ডাঃ ফাহিম ডেথ ফাইল প্রস্তুত করতে গেলে নিহত আনোয়ারের স্বজনদের সঙ্গে হাতাহাতি হয়। আনোয়ারের স্বজনরা ডাঃ ফাহিম ডেথ ফাইল পরিবর্তন করে ভুল চিকিৎসায় আনোয়ারের মৃত্যুকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করতে পারেন- এমন সন্দেহে ডাঃ ফাহিমের উপর চড়াও হয়। এক পর্যায়ে হাসপাতালের কয়েকটি কাঁচের জানালাও ভাঙচুর করে তারা। ওই ঘটনার পর থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দেয় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। তাদের সঙ্গে নিয়মিত চিকিৎসকরাও যোগ দেয়। এরপর অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় হাসপাতালে। এ বিষয়ে বিক্ষোভ-মানববন্ধন করেছে রোগির স্বজন ও স্থানীয়রা। ৮ এপ্রিল কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে স্ব-স্ব কর্মস্থলে যোগদান করে নিয়মিত চিকিৎসকদের পাশাপাশি ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ৫ দিনের কর্মবিরতিকালীন বিনা চিকিৎসায় মারা যায় এক শিশু ও তিন নারীসহ অন্তত ৮জন।
এদিকে, কর্মে ফিরে যাওয়ার একদিনের মাথায় ৯ এপ্রিল মূমূর্ষূ শিশু রোগির চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় দফায় হট্টগোল হয়। হাসপাতালের সার্জন ডা: আনিসুল হোসেনের সাথে রোগীর স্বজন মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ ওরফে ম্যাক্স এর কথা কাটাকাটির সুত্র ধরে তাকে হাসপাতালের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরে মামলা দিয়ে তাকে থানায় সোপর্দ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ওই দিন দীর্ঘক্ষণ বন্ধ থাকে। যার ফলে সারাদেশের সংবাদ ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় উঠে। পরে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে হাসপাতালে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ ওরফে ম্যাক্স ১৫ এপ্রিল কারামুক্ত হন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •