সাপাহার (নওগাঁ) সংবাদদাতাঃ
মহামান্য হাইকোর্টকে ভুলতথ্য দিয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যায়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) সাপাহার চৌধুরী চাঁন মোহাম্মদ মহিলা ডিগ্রি কলেজে নিয়োগ দেয়া প্রভাষক মো: জিয়াউর রহমানের নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে তার বিল বেতন আটকানো হয়েছে বলে দাবী করেছেন ভুক্তভোগী ওই প্রভাষক। তিনি দীর্ঘ দিন চাকুরী করেও কোন বিল বেতন না পেয়ে বিনা বেতনে প্রতিষ্ঠানে পাঠ দান ও মামলা চালিয়ে হাপিয়ে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এরপর ওই প্রভাষক তার নিয়োগের বৈধতা চেয়ে করা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথাও রয়েছে আজ বৃহস্পতিবার। গত বছরের ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি এসডি/- হাসান ফয়েজ সিদ্দিক এই দিন ধার্য করেছেন।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৬ জুন গণবিজ্ঞপ্তি অনুসারে এনটিআরসিএ সকল বাংলাদেশী নিবন্ধনধারীদের নিকট থেকে দরখাস্ত আহ্বান করে। এছাড়া দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছ থেকে শূন্য পদের তালিকা চায় এনটিআরসিএ। সেই মোতাবেক নওগাঁর সাপাহারের চৌধুরী চাঁন মোহাম্মদ মহিলা ডিগ্রি কলেজ কর্তৃপক্ষও একটি শূন্যপদের তালিকা দেয়। এনটিআরসিএ-এর ওয়েব সাইটে প্রদর্শিত (২৫৮/২০১৫ এর ০৮-০৯-২০১৫ তারিখের রেজুলেশন অনুযায়ী) সাপাহার উপজেলার পাতাড়ী গ্রামের জিল্লুর রহমানের ছেলে মো:জিয়াউর রহমান প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। এরপর এনটিআরসিএ তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রভাষক (এইচএসসি লেভেল) পদে নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রার্থী, কলেজের অধ্যক্ষ ও গর্ভানিং বডির সভাপতির কাছে মোবাইল ক্ষুদে বার্তা পাঠায়।
এনটিআরসিএ-এর ওয়েব সাইট থেকে যোগদান পত্র প্রিন্ট করে কলেজে দেয়া হলে ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়োগ প্রদান করেন। এর প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ১ নভেম্বর তিনি ওই কলেজে যোগদান করেন। এরপর হতে অদ্যবদি প্রতিষ্ঠানের সকল নিয়ম কানুন মেনে অত্র কলেজে কর্মরত রয়েছেন তিনি।
কর্মরত অবস্থায় তিনি এমপিওর প্রতিষ্ঠান প্রধানের ফরোয়াডিং,শিক্ষক স্টাপ তথ্য, নিউজ পেপার,এনটিআরসিএর মূল,নিয়োগ পত্র(২৪-১০-২০১৬), যোগদান পত্র(০১-১১-২০১৬),ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা, মূল রেজাল্ট সিট(সি.এস),এমপিও কপি,জিবি রেজুলেজন(২৫৮/২০১৫,২৭২/২০১৬,২৭৩/২০১৬), ওই পদে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাগজপত্র, নন-ড্রায়াল, প্রথম ও শেষ স্বীকৃতি, বিষয় অনুমতিপত্র, লোকেশনের কাগজপত্র সংগ্রহ করে ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল (ট২৭/অ১/৯-৪-২০১৭২০৩৬৫৪) এমপিও অনলাইনে সাবমিট করেন। কিন্তু এসময় রাজশাহী আঞ্চলিক শিক্ষা অধিদপ্তর শাখার উপপরিচালকের কার্যালয় থেকে ২০১৭ সালের ১৪ মে এমপিও
আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং মো. আব্দুল হালিম নামে একজন শিক্ষকের একটি হাইকোর্টে দায়ের করা রিট কপি যার নম্বর১(৫৩৭৯/২০১৬) আবেদনের কথা শত্রুতা করে উপ-পরিচালক মহোদয়কে জানানো হয়।
এবিষয়ে ওই কলেজের অধ্যক্ষ, আবু এরফান আলী বলেন, মো, আব্দুল হালিম ২১৯/২০১২ রেজুলেশনের মাধ্যমে চৌধুরী চাঁন মোহাম্মদ মহিলা ডিগ্রি কলেজে অনার্স কোর্সের জন্য নিয়োগকৃত শিক্ষক। তিনি অনার্স কোর্সের জন্য নিয়োগ নেন ২০১২সালের ৩ সেপ্টম্বর। তারপর থেকে তিনি অনার্স কোর্সের শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করতে থাকেন। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০১৩ সালের ৩ জুলাইয়ের পরিপত্র অনুযায়ী তাকে এই (ইন্টারমিডিয়েট লেভেল)শূন্য পদে ২৪৫/২০১৪ নং রেজুলেশন করে অনার্স স্তর থেকে সমন্বয় করা হয়েছিল। এবং এমপিও ভুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। এসময় তার এমপিওর আবেদনের প্রক্ষিতে মাওউসির মহাপরিচালক (অনার্স কোর্সের জন্য নিয়োগকৃত শিক্ষকের প্যার্টানভূক্ত পদ না থাকায় তখন তার এমপিওভূক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে লিখিত জবাব দেন। এর পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের ৯ মার্চে একটি পরিপত্র জারি করেন। ওই পরিপত্রে বলা হয়, জনবল কাঠামো নির্দেশিকা অনুযায়ী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষ নিয়োগপ্রাপ্ত ডিগ্রি স্তরের প্রভাষকদের উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে প্যাটানভূক্ত শূন্য পদে সমন্বয়ের কোন সুযোগ নেই। ২০১৮ সালের এমপিও নীতিমালায়ও বলা হয়েছে, অনার্স স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি স্তরে সমন্বয়ের সুযোগ নেই। তবে ডিগ্রি পাস কোর্স থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে এমপিও নয় এমন পদ থেকে সমন্বয় করা যাবে।
অধ্যক্ষ,আবু এরফান আলী আরো বলেন, তাই আমরা পুনরায় অবসরপ্রাপ্ত হাবিবুর স্যারের পদটি (২৫৮/২০১৫) রেজুলেশনের মাধ্যমে শূন্য ঘোষণা করে পত্রিকায় প্রথমে মহিলা কোটা অনুসারে ১ম বার ২০১৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক মানব জমিন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করি। তারপর আবারো মহিলা কোটা অনুসারে ২য় বার ২০১৫ সালের ১৯ অক্টোবর দৈনিক সমকাল এবং স্থানীয় করতোয়া পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। মহিলা প্রার্থী না পাওয়ায় আবার ৩য় বার মহিলা/পুরুষ ২০১৫ সালের ৭ নভেম্বর দৈনিক সমকাল এবং করতোয়া পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এনটিআরসিএর পরিপত্র অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবরের পর সকল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। তবে ২০১৫ সালের ২২অক্টোবরের আগের হলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে পারে। তাই আমি ২২অক্টোবরের আগেই এনটিআরসিকে শূন্য পদের চাহিদা দিয়েছি। এসব নিয়ম মেনেই এই পদে জিয়াউর রহমানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি এখনও প্রতিষ্ঠানের দেয়া সব দায়-দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক জিয়াউর রহমান বলেন,আমি এনেক্স, এ´.ভবনের ২০৭ ঘরের এ্যাডভোকেট মোঃ আব্দুস সামাদ নামে এক জনকে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করি। কিন্তু বিজ্ঞ আইনজীবী বিশেষ কোন করণে কোর্টে মামলার শুনানির দিন উপস্থিত হতে পারেননি এবং আমার পক্ষের কোন প্রকার কাগজপত্র উচ্চ আদালতে পেশ করতে পারেননি সে কারণে ২০১৭ সালের ৫ জুন মো. আব্দুল হালিম নামের ওই শিক্ষক এক তরফাভাবে মামলার রায় পেয়ে যান।
তিনি আরো বলেন, এসময় তিনি এনটিআরসিএর যাবতীয় কাগজপত্র না দেখিয়ে মহামান্য আদালতকে ভুলতথ্য ও ভুল কাগজপত্র দিয়ে এক তরফা রায় তার পক্ষে নিয়ে নেয়। উক্ত রায়ের পুর্নাঙ্গ কপিটি আমি ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে কোর্ট থেকে তুলি। রায়ে বলা হয়েছে, বিবাদী পক্ষের কোন উকিল, ডকুমেন্ট না থাকায় মো. আব্দুল হালিমকে ৩০ কার্যদিবসে এমপিও দেয়া হোক। রায়ের কপি পাওয়ার পর আমি এডভোকেট মো. আব্দুস সামাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ঢাকায় ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি একটি অভিযোগ দাখিল করি। তারপর এনটিআরসিএ মৌখিকভাবে আমাকে উচ্চ আদালতে আপিল করতে বলায়, আমি ৫৮৫/২০১৮ সালে একটি আপিল করেছি এবং সরকারপক্ষও আপিল ৭১৪/২০১৮ করেছে। আপিল দুটো এক সাথে শুনানি করা হলে তামাদি বলে খারিজ করে আদালত। এর পর আমি ৫৮৫/২০১৮ আপিলের বিরুদ্ধে সিভিল রিভিউ পিটিশান ৫০৮/২০১৮ দায়ের করি। দীর্ঘ দিন চাকুরী করেও কোন বিল বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে জিয়াউর রহমান নামের ওই প্রভাষক। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থা রেখে আশা করছেন তার নিয়োগ প্রক্রিয়া ও সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মহামান্য আদালত সঠিক রায় দেবেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •