যুগান্তর : দেড় মাস ধরে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা চলার পর ১ এপ্রিল শুরু হয়েছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এ পরীক্ষা চলবে ২১ মে পর্যন্ত। এ ধরনের একটি পরীক্ষা নিতে দেশের অন্তত ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন্দ্র ও ভেন্যু করতে হয়।

যেসব স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় পরীক্ষা নেয়া হয় সেখানে সর্বনিু ১ মাস থেকে সর্বোচ্চ পৌনে ৩ মাস ক্লাস বন্ধ থাকে। শুধু এ দুই স্তরের পাবলিক পরীক্ষাই নয়, ডিগ্রি, অনার্স-মাস্টার্স এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা গ্রহণের জন্য কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরে ৩ থেকে ৪ মাস বন্ধ থাকে। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এমন পরিস্থিতিতে বহুদিন ধরে শিক্ষা কেন্দ্রের বাইরে স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের দাবি আছে।

এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উপজেলা পর্যায়ে আলাদা পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরকে (ইইডি) এ কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

কাজ বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগ্রহণকারী বিভিন্ন সংস্থার বৈঠক হয়েছে। এতে প্রতি উপজেলায় একটির পরিবর্তে একাধিক পরীক্ষার ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এতে সারা দেশে অযথা অন্তত আড়াই হাজার একর ভূমি নষ্ট হবে। এর পরিবর্তে উপজেলায় বহুতল ভবনে পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।

জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। বর্তমানে ডিপিপি (বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরির কাজ চলছে। আশা করছি, শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে তা পাঠানো সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব পরীক্ষা নেয়া হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বড় পিইসি। এ কারণে ২০১৭ সালের পিইসি পরীক্ষার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার সঙ্গে আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধি ধরে প্রতি উপজেলার ভবিষ্যৎ পরীক্ষার্থী নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ওই সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা হলের জায়গা নিরূপণ করা হয়। প্রতি কক্ষে ১শ’ শিক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা করা হবে। একটি ভেন্যু কেন্দ্রে একসঙ্গে ৪ হাজার পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।

সেই হিসাবে একটি উপজেলায় একাধিক পরীক্ষার ভেন্যু হবে। প্রতি ভেন্যু ৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ৪ একরে ভবন হবে। বাকিটা পুকুর, উন্মুক্ত স্থান ও বাগানেরর জন্য থাকবে। ৫ তলার বেশি ভিত হলে ভবনে লিফটের ব্যবস্থা থাকবে। ভবনের জমি অধিগ্রহণে যাতায়াত সুবিধা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। পরীক্ষা ছাড়া বছরের বাকিটা সময় কমিউনিটি সেন্টারসহ সামাজিক অনুষ্ঠানাদির জন্য বহুমুখী ব্যবহারের প্রস্তাবও আছে। এতে বেসরকারি আয়ের পথও উন্মুক্ত হবে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক তপন কুমার সরকার যুগান্তরকে বলেন, দেশে বর্তমানে অসংখ্য পাবলিক পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে আছে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষা। হালে যোগ হয়েছে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষা। এসব পরীক্ষা যেসব প্রতিষ্ঠানে নেয়া হয়, সেখানে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বলতে গেলে ওই সময়ের জন্য একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

অনেক সময়ে পরীক্ষার কেন্দ্রের বেঞ্চের চাহিদা পূরণে আশপাশের প্রতিষ্ঠান থেকে আসবাবপত্র টানাটানি করতে হয়। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি কোনো কোনো কেন্দ্রে (স্কুল বা কলেজ) তিনটি পরীক্ষাও নেয়া হয়। এতে ওই প্রতিষ্ঠান বছরের অন্তত অর্ধেক সময়ই বন্ধ থাকে। এতে লেখাপড়া দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আলাদা পরীক্ষার হল করা হলে শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ হবে না। পাশাপাশি পরীক্ষা চলবে। মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে এ ধরনের কেন্দ্র দরকার আছে।

শিক্ষা নিয়ে গবেষণা সংস্থা গণসাক্ষরতা অভিযানের (ক্যাম্পে) উপ-পরিচালক কেএম এনামুল হক যুগান্তরকে বলেন, পরীক্ষার ছুটির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্ধারিত বার্ষিক আরও নানা ছুটি যুক্ত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় শ্রেণী কার্যক্রম বন্ধ থাকা শিক্ষা ব্যবস্থা কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ। সুতরাং এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার জন্য তা খুব ভালো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যদি সরকার সেই উদ্যোগ নেয় তাহলে তাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে পরীক্ষার কেন্দ্র নির্মাণে মিতব্যয়ী হওয়াটা জরুরি। একই ভবনে সব পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হলে ভেন্যু কেন্দ্র নির্মাণের নামে বাড়তি জমি অপচয় বন্ধ হবে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্ন ফাঁসের যে অভিযোগ উঠেছিল, তাতে ভেন্যু কেন্দ্রের একটি নেতিবাচক প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।

মাউশির এক কর্মকর্তা জানান, উপজেলায় ভেন্যুগুলো পরিচালনার জন্য সম্ভাব্য জনবল কাঠামোর প্রস্তাবও তৈরি হয়েছে। ষষ্ঠ গ্রেডের পদমর্যাদার একজন কর্মকর্র্তা হবেন উপজেলায় পরীক্ষা কেন্দ্রের সমন্বয়ক বা প্রধান।

তার সঙ্গে প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদার দু’জন সহকারী সমন্বয়ক থাকবেন। এ তিনজনই পদায়ন করা হবে শিক্ষা ক্যাডার থেকে, যাদের নিয়ন্ত্রণকারী হবে মাউশি। এছাড়া একেকটি কেন্দ্রে অফিস সহকারী, স্টোর কিপার, হিসাবরক্ষক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, গাড়িচালক, অফিস সহায়ক, নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য সাধারণ পদে জনবল থাকবেন। সব পদই রাজস্ব খাতের হবে।

প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্র হবে আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা সম্পন্ন। যাতে সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা দ্বারা পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করা যায়। থাকবে সাদা বোর্ড, ইন্টারনেট সংযোগ, মাল্টিমিডিয়া, জেনারেটর এবং সোলার সিস্টেম, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। প্রশ্ন ও উত্তরপত্রসহ পরীক্ষার সরঞ্জাম পরিবহনে মূল কেন্দ্রের পাশাপাশি ভেন্যু কেন্দ্রের জন্য একটি করে মাইক্রোবাস থাকবে ।

পরীক্ষার্থীর বয়স বিবেচনায় কেন্দ্রে বেঞ্চ থাকবে। এর মধ্যে পিইসি পরীক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের বেঞ্চ দরকার। জেএসসি এবং এর উপরের পরীক্ষার জন্য আরেক ধরনের বেঞ্চ দরকার। ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় এসব রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •