ইব্রাহিম খলিল মামুন:

কক্সবাজার শহরের ঝিলংজা মৌজায় পাহাড় ও টিলা অধিগ্রহণ করে বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের সমস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ ঘোষণা করেছে আদালত। রোববার (৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার শুনানী শেষে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দীকী, বিচারপতি জিনাত আরা এবং বিচারপতি নূরুজ্জামান-এর সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ এ নির্দেশ প্রদান করে নিয়মিত আপীল করার অনুমতি দেন।

বেলা’র পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সিনিয়র আইন আইনজীবী ফিদা এম কামাল, এ এম এম আমিনউদ্দীন ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং বিবাদী পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মাহবুবে আলম।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পরিবেশ আইনবিদ সমিতির প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রীম কোর্টেও আইনজীবি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

জানাযায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার কাছে একটি চিঠি দেয়া হয়। বিউবোর কক্সবাজার বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মু. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, শহরের কলাতলী এলাকার ঝিলংজা মৌজার ১৭০৩০ নং দাগের চার একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এতে উল্লেখ করা হয়, জমিটি পাহাড় শ্রেণীর। এরপর জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা। পরে বিষয়টি প্রচার হলে কক্সবাজারের বাসিন্দাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা ) পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলার প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কলাতলী এলাকায় পাহাড়ি জমিতে বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসন প্রকল্পসহ নির্মাণসহ জমি অধিগ্রহণের সমহমসত কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনাদেয় আদালত। একই সাথে এর আশপাশের এলাকায় পাহাড় কাটা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি ওই এলাকা কেন প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হবেনা এবং এ এলাকায় পাহাড়গুলো সংরক্ষণ করতে ব্যর্থতাকে কেন দায়ী করা হবেনা তা জানতে চার সপ্তাহের মধ্যে মামলার বিবাদীদের প্রতি রুল জারি করে আদালত।

পাশাপাশি রুলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উক্ত জমি অধিগ্রহণের জন্য এলএ কেস নং ১/২০১৪, ১/২০১৫ এর কার্যকারিতা স্থগিত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এফিডেভিট ইন অপোজিশন আদালতে দাখিল করে বিকল্প জায়গায় তাদের স্থান নির্ধারণ করার আবেদন করলেও, গত ৫ এপ্রিল বিচারপতি নাঈমা হায়দার এবং বিচারপতি জনাব আহমেদ-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চ কক্সবাজার সদর উপজেলাধীন ঝিলংজা মৌজার খতিয়ান নম্বর-১, জে.এল নম্বর-১৭, বি.এস দাগ নম্বর-১৭০৩০/৩৭৬৪৪, ১৭০৩০/৩১৮৯৪, ১৭০৩০/৩৭৬৪৩ এবং ১৭০৩০ দাগের জন্য এল এ কেস চলমান রেখে পরিবেশ অধিদপ্তরকে একটি কমিটি গঠন করে অধিকৃত জমিতে স্থপনা নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়টিকে তদারকি করতে আদেশ দেন যাতে করে কোনরূপ বন উজাড় বা পাহাড় কাটা না যায়। আদালত আরো নির্দেশ প্রদান করেন যে, যদি পরিবেশ অধিদপ্তরের নিকট এ নির্মাণ কাজ অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান হয় তবে এ সংক্রান্ত আইন ও বিধি পর্যালোচনা করে সঠিক বলে বিবেচিত হলে অনুমতি দিতে পারে সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণপূর্বক উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে অধিগ্রহণকৃত জায়গাতে অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি প্রদান করতে পারে। কিন্তু উক্ত অধিগ্রহণ মামলার তফসিলে দেখা যায় অধিগ্রহণের প্রস্তাবকৃত জমির পরিমাণ সর্বমোট ৪ একর যার মধ্যে ৩.৯৮ একর জায়গা পাহাড় বা টিলা এবং উক্ত জমির জন্য এল এ কেস নং ১/২০১৪, ১/২০১৫- তে কক্সবাজার ঝিলংজা মৌজায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ৪ একর ভূমি অধিগ্রহণের নিমিত্তে ক্ষতিপূরণ ও আনুসঙ্গিক বাবদ প্রক্কলিত মূল্য ৩২,৯৪,৩৮০০২/৬৮ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চলমান রাখায় হাইকোর্টের এ রায়ে সংক্ষুবদ্ধ হয়ে বেলা প্রথমে সিএমপি (নং-৪০৯/২০১৮) ও পরে সিপি (নং-৭৪/২০১৯) দায়ের করে। গত ৩১ মার্চ তারিখে শুনানী শেষে রোববার আদালত এ আদেশ প্রদান করেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এর ওহংঃধষষধঃরড়হ ড়ভ ঝরহমষব চড়রহঃ গড়ড়ৎরহম প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার বন অধিদপ্তরের নামে রেকর্ডকৃত ১৯০.৯৫৬ একর সংরক্ষিত বনভূমি ব্যবহারের জন্য বনজসম্পদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১,৩৬,৭৪,৯৪৯.১০ টাকা বিপিসি কর্তৃক পরিশোধিত হয়েছে। সেখানে একই জেলার মাত্র ৪ একর ভূমির মূল্য ৩২,৯৪,৩৮০০২/৬৮ টাকা অস্বাভাবিক বটে। তাছাড়া এ মামলায় অতিরিক্ত পক্ষভুক্ত হয়ে আবেদনকারী মোঃ জামাল উদ্দিন খান ও মোঃ জিয়াউল হায়দার হাশমী তাদের দাবিকৃত অংশের মূল মালিক নন। তারা ভূমিহীন ব্যক্তিদের চাষাবাদের জন্য সরকারি কৃষি জমি বিনা সালামীতে এবং বিনা খাজনায় বন্দোবস্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিদের নিকট থেকে পাওয়ার অব এ্যাটর্নীর মাধ্যমে মালিকানাস্বত্ব অর্জন করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •