ছোটগল্প :
– জামাল হোসেন

ইমরুলের পিতা আশরাফ সাহেবের বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই অবস্থা। মানুষ আজকাল ক’বছরই বা বাঁচে। গড়ে মাত্র ষাট বছর। তাই ইমরুলের পিতা আশরাফ সাহেবের স্বপ্ন তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তান ইমরুলের জন্য একটা নম্র, ভদ্র, শিক্ষিতা এবং ভালো ঘর দেখে একটা  বউ আনবে।

ইমরুলের পিতা যতদিন যাচ্ছে ততই অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে। দুচোখ বুঁজে একটু ঘুম আসলেই পুত্রের বিয়ে নিয়ে নানান স্বপ্ন দেখেন। ক্লাব ভর্তি মানুষ, সানাই বাজছে, ঘোড়ার গাড়িতে করে পুত্র বধূ ঘরে আসছে ইত্যাদি আরও নানান স্বপ্ন।

ইমরুল বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করছে। এখন মাস্টার্স পড়ছে। এই মুহূর্তে তার ধ্যান জ্ঞান পড়াশুনাতে। সে অনেকবার তার বাবাকে বুঝিয়েছে এখন সে কিছুতেই বিয়ে করবেনা। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হয়নি। ইমরুলের মা ও তার ছেলের পক্ষে আছেন।

ইমরুল তার “না” তে অটল আছে। এরইমধ্যে তার বাবা অসুস্থ হয়ে যায়। ট্রিটমেন্ট চলছে। বন্ধু-বান্ধব, পাড়া, প্রতিবেশী সবার কথা, “ইমরুল, বিয়ে করলে তোমার পড়ালেখা এবং ক্যারিয়ার যে মাটি হবে এমন কোনো কথা নেই। আল্লাহ্ না করুক, তোমার পিতার যদি তোমার বউ না দেখার আগে মৃত্যু হয়, তাহ‌লে তুমি সারাজীবন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেনা।”

ইমরুল ভাবতে থাকে সে কী করবে? ইদানীং সে কেমন জানি আনমনা হয়ে গেছে। যে ইমরুল সাহিত্যের কোনো বই যেখানে কোনদিন ছুঁয়েও দেখতোনা সেই ইমরুল আজকাল অনেক বিশ্ববিখ্যাত মনীষীর বই ঘরে এনেছে। মনীষীদের জীবনী ঘাঁটতে থাকে। সে দেখে, অনেক মনীষী খুব অল্প বয়সে বিয়ে করে সুখে ঘর করেছে সারাজীবন। তারা তাদের জীবনের শত প্রতিকূলতায়ও কোনো লক্ষে পৌছতে কখনো থেমে থাকেননি।

ইমরুল সব ভেবে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়, সে বিয়ে করবে। পিতার পছন্দেই বিয়ে করবে। পুত্রের বিয়েতে মত দেখে আশরাফ সাহেবের শারীরিক অবস্থা এখন আগের চেয়ে একটু ভালোর দিকে।

ইমরুলের জন্য পাত্রী দেখার জন্য পরিবার এবং আত্মীয়দের মধ্য থেকে ৫ জনকে নিয়ে একটা পাত্রী দেখা কমিটি গঠন করা হলো। ইমরুলের জন্য পাত্রী দেখা শুরু হলো। অনেক কষ্টে নম্র, ভদ্র, শিক্ষিতা এবং ভালো ফ্যামিলির মেয়ে পাওয়া গেলেও আরেকটা জায়গায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। আর তা হলো, মেয়েকে গ্রাজুয়েশন কম্পিলিট ও হতে হবে। ইমরুলের পিতার এক জবান, এক কথা, তার গ্রাজুয়েট ছেলের জন্য গ্রাজুয়েট বউ লাগবেই।

সাত উপজেলার আনাচে কানাচে পাত্রী খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত একটা মেয়েকে প্রায় সবারই পছন্দ হলো। ইমরুলের বাবা আশরাফ সাহেবের গ্রাজুয়েট ছেলের জন্য গ্রাজুয়েট বউ ঠিক হলো।

দুই ফ্যামিলির সিদ্ধান্ত মতো মাসের মধ্যেই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো। সানাই বাজিয়ে, ঘোড়ার গাড়িতে করে পুত্রবধূ ঘরে আনা হলো।

ইমরুল খুব ভোরেই বের হয়। টিউশন, ভার্সিটি ও কোচিং সেন্টারেই তার সারাটি দিন কেটে যায়। বাড়িতে ফেরে রাতে। সকালে বের হওয়ার সময় নাঈমাকে বলে যায়, “জানু, তোমার সারাদিন কোনো কাজ নেই। যতক্ষণ রান্নাবান্না করতে হয় করবা। এরপর বাকি সময়টা আব্বা আম্মার খেদমত করবা। তাদের পাশে বসে থাকবা। কেমন?”

স্ত্রী নাঈমাও লক্ষী বউয়ের মতো কখনো স্বামীর অবাধ্য হয়না। সারাটা দিন শ্বশুর শ্বাশুড়ির সেবা করতে থাকে।

ইমরুলের জীবন খুব ভালো ভাবেই কাটছে। তার সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে যখন বাড়িতে ফিরে তার বাবা, মা এবং স্ত্রীর হাসিমাখা মুখ দেখতে পায়। সে তখনই নিজেকে স্বার্থক মনে করে।এতে ইমরুল স্বর্গসুখ খুঁজে পায়।

ইমরুলের এ সুখ বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। পুত্রবধূ ঘরে আনার ঠিক ১ মাস ০৪ দিনের মাথায় একদিন বিকেলে হঠাৎ আশরাফ সাহেবের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ইমরুলের মা ইমরুলকে খবর দিলেন। ইমরুল ছুটে এলেন। এম্বুলেন্সকে খবর দেয়া হলো।

আশরাফ সাহেব বললেন, “আমাকে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো দরকার নেই। আমার হায়াৎ শেষ। মৃত্যুর ফেরেশতা আমাকে ডাকছে। সবাই আমাকে ক্ষমা করো। আমার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করো।” পুত্র ও পুত্রবধূকে ডেকে বললেন, “মা, বাবা,- তোমরা সুখী হও।” স্ত্রী সালমা বেগমকে কাছে ডেকে বললেন, “বউ, জীবনে আমার অজান্তে কোনো ভুলে যদি তুমি কষ্ট পেয়ে থাকো, প্লিজ আমাকে ক্ষমা করো। এরপর কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” পড়তে পড়তে আশরাফ সাহেব এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।

ইমরুলের পুরো পরিবার শোকাহত। আশরাফ সাহেব হঠাৎ এভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।

ইমরুল শোকাহত। পিতাকে সে খুব বেশী মিস করছে। তার মধ্যে এখন এক আকাশ শূন্যতা বিরাজ করে। পিতা হারানোর শূন্যতা। সে এখন পিতা হারাদের দলে। কিন্ত একটা ব্যাপার নিয়ে ইমরুলের এখন খুব গর্ববোধ হয়। কারণ, নাঈমাকে ঘরে আনার পর বিশেষ কারণে নাঈমা কখনো বাপের বাড়িতে যাননি। তাই ঠিক ঐ ১ মাস ০৪ দিনের সময় গুলোতে শ্বশুরের খেদমত করতে পেরেছেন। নাঈমার মতো ভাগ্যবতী মেয়ে আর কে হতে পারে?

ইমরুলের পিতা নেই, কিন্তু এখনো মা আছেন। এখন মা’ই ইমরুলের বাবা এবং মা।

১২ বছর পর ।
সময় রাত ৯ টা বেজে ১৫ মিনিট। ইমরুল এইমাত্র বাসায় ফিরেছেন। এসেই ‘আম্মুনি’ বলে ডাক দিলো। স্ত্রী নাঈমার কোলে তার ১বছরের ফুটফুটে মেয়েটি হাসছে। দুহাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বাপের কোলে উঠার জন্য। পাশের রুমে তার পুত্র নাহিয়ান পড়তেছিলো। সেও এসে ‘আব্বু’ বলে পিতার পাশে এসে বসলো।

ইমরুল মাকে ডাক দিলো, “মা, ও মা। ঘুমিয়ে পড়েছেন নাকি?”

ইমরুলের রুমের পাশেই মায়ের রুম। ইমরুল মায়ের রুমের দিকে গেলেন।
সালমা বেগম বললেন, “নারে বাবা ! একটু ঘুম পাচ্ছিলো।”

সালমা বেগম বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। বার্ধক্য ধরা দিয়েছে। পুত্র ইমরুল ও নাঈমা ওনার সেবাযত্ন ও চিকিৎসার কোনো কমতি রাখছেন না। তাই বয়স হিসেবে এখনো উনি অনেক সুস্থ আছেন।
সালমা বেগম বিছানা ছেড়ে উঠেছেন। নাতী নাহিয়ান এসে হাত ধরে টানতেছে।
” ও দাদু- দাদু। চলেন। আম্মু খাবার রেডি করতেছে।”

এই বয়সে মনে হচ্ছে যেন , ছোট নাতির হাত ধরে আরেক ছোট নাতনি হেটে চলছে। বয়সের পার্থক্য থাকলেও বয়সের ভারে দাদীও শিশু!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •