কামাল হোসেন,রামু (কক্সবাজার):
কক্সবাজারের রামুতে রয়েছে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের বাসভবন। রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের অফিসেরচর এলাকায় বাঁকখালি নদীর পাড়ে ছায়ানীড় পাখিডাকা ছোট্ট ডাকবাংলোটি ক্যাপ্টেন কক্সের স্মৃতিকে লালন করে গভীর মায়ায়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি ইতিহাসের স্বাক্ষী এই বাসভবনটি এখন জেলা পরিষদের ডাক বাংলো হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যার নাম অনুসারে কক্সবাজারের নামকরণ সেই মহান ব্যক্তির বাসভবনে আজ তাঁর কোন স্মৃতির লেশ মাত্র নেই। এই ভবনটি সংরক্ষণের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া না হলে কালের গহ্বরে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত এই বাসভবনটি হয়তো বিলীন হয়ে নতুন ভবন তৈরি হলে আপসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। তাই এই বাংলোকে প্রত্নতত্ত্ব ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষন করা অত্যাবশ্যক। এটি এখন সময়ের দাবি।পাশাপাশি কক্স মেমোরিয়াল কমপ্লেক্স স্থাপন করা হলে স্থানটি আরো সমৃদ্ধ হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা রামুর এই প্রাঙ্গনেই ক্যাপ্টেন কক্স তাঁর প্রশাসনিক কাজ করতেন।

কে এই ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স ?

ঐতিহাসিক সুত্রমতে,বার্মা রাজা বোধাপায়া ১৭৮৪ খ্রীষ্টাব্দে স্বাধীন আরকান রাজ্য দখল করেন। বোধাপায়ার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে তৎকালীন বৃটিশ শাসিত পালাংক্রী এলাকায় দলে দলে পালিয়ে আসে আরাকানের স্থায়ী বাসিন্দা রোহিঙ্গারা। প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পূনর্বাসনের জন্য বৃটিশ সরকারের পক্ষে বার্মায় কর্মরত সামরিক অফিসার ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে পালাংক্রীতে পাঠানো হয়। তিনি পালাংক্রীর দূর্গম জংলী এলাকায় রোহিঙ্গাদের পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে এলাকাটি আবাদ হয়। তিনি বর্তমান রামুতে নিজের বাসস্থান ও অফিস নির্মান করেন। তিনি একটি বাজারও স্থাপন করেন। তাঁর নামেই পালাংক্রীর নামকরন হয় কক্সবাজার।
পরবর্তীতে এ বাজারের নাম হয় কক্স সাহেবের বাজার। পরে কক্সবাজার। রোহিঙ্গাদের পূনর্বাসনের সময় ১৭৯৯ সালে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
তাঁর স্ত্রী ম্যাডাম কক্স পিয়ার তাঁর মৃতদেহ নিয়ে যাবার জন্য বর্তমান ডুলাহাজারা ও খুটাখালীর মধ্যবর্তী এলাকার বড় খালে জাহাজ নিয়ে আসেন। ঐ জাহাজে করে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের মৃতদেহ নিয়ে যান। সেই থেকে ঐ এলাকার নাম ম্যাডাম কক্স পিয়ার লোকমুখে মেদাকচ্ছপিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেছে।অনেক ঐতিহাসিকদের মতে,কক্সের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর বাসভবনের সামনে দিয়ে প্রবাহিত বাঁকখালি নদী দিয়ে।যাত্রাপথে রামুর বর্তমান কচ্ছপিয়া নামক এলাকায় মেডাম কক্স পিয়ার যাত্রাবিরতি করেন।তার স্মৃতি স্বরুপ ঐ এলাকার নাম কচ্ছপিয়া হয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
মতান্তরে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে বাংলোর পাশে বাঁকখালির তীরে সমাহিত করা হয়। কিন্তু নদী ভাঙ্গন তাঁর সমাধিকে ভাসিয়ে নেয়।
সম্প্রতি সিভিল সোসাইটিজ ফোরাম কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী,সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কক্সবাজার জেলার সাবেক কমান্ডার মো. শাহজাজাহান, প্রেসিডিয়াম সদস্য আনম হেলাল উদ্দীন, সমীর পাল, সাধারন সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার কানন পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সল সাকিব, জেলা বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক পরিষদের সাধারন সম্পাদক সুরেশ বাঙ্গালী, সাস্কৃতিক সম্পাদক জসিম উদ্দীন ক্যাাপ্টেন হিরাম কক্সের বাসভবন কাম অফিস পরিদর্শনে যান।
বর্তমানে ভবনটি কক্সবাজার জেলা পরিষদের ডাকবাংলো হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বদরুদ্দীন নামের এক বৃদ্ধ কেয়ার টেকার হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এতবড় একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে গত ২৫ বছর ধরে কাজ করলেও তিনি জানতেন না। এখন জেনে নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছেন।
সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের নেতৃবৃন্দ এ স্থাপনা দেখে ফিরে যান সেই হিরাম কক্সের সময়ে। সেই সময় কেমন ছিলো কক্সবাজার? তিনি থাকলে তাঁর সাথে কথা বলা যেতো। এক ধরনের নষ্টালজিয়া তাঁদের আচ্ছন্ন করে রাখে অনেক্ষণ। নেতৃবৃন্দ এতবড় ঐতিহাসিক স্থাপনায় কোন সাইন বোর্ড না থাকায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাঁরা অবিলম্বে এ ঐতিহাসিক স্থাপনায় সাইন বোর্ড স্থাপন ও এটাকে সংরক্ষণ করে পর্যটকদের আকর্ষনীয় করার দাবী জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •