সিবিএন ডেস্ক:
মোবাইল ফোনের কলরেটের সঙ্গে স্বল্প হারে সারচার্জ বা লেভি যুক্ত করে দেশের ক্যানসার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্যবীমা চালুর সুপারিশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকনোমিকস এবং জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই স্বাস্থ্যবীমার লক্ষ্যে এ দুই প্রতিষ্ঠানের দুইজন বিশেষজ্ঞ একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছে।

এক হিসাবে, দেশে এখন ২৫ হাজার মানুষ ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর কিডনি রোগে আক্রান্ত ৬০ হাজার রোগীর সপ্তাহে তিন ডোজ ডায়ালায়সিস নিতে হয়। তবে যে সক্ষমতা আছে তাতে ১৫ হাজার রোগীকে ডায়ালায়সিস দেওয়া যায়। প্রস্তাবিত এই স্বাস্থ্যবীমা চালু হলে বিপুলসংখ্যক রোগী উপকৃত হবেন।

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এই সারচার্জ বীমার প্রিমিয়াম হিসেবে গণ্য হবে। একজন গ্রাহক ক্যানসার বা কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট বয়স থেকে ক্যানসার স্ক্রিনিং ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পাবেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বীমার প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্যর একটি ট্রাস্ট, অন্যটি সলিডারিটি। ট্রাস্ট হচ্ছে কোনও ব্যক্তি যে টাকাটা দিচ্ছেন, যে উদ্দেশ্যে দিচ্ছেন, সে ধরনের কোনও ঘটনা যদি তার নিজের ক্ষেত্রে ঘটে, তাহলে সেটা থেকে তিনিও উপকার পাবেন। আর সলিডারিটি হলো একে অপরের দুঃখকষ্টের সঙ্গে অংশীদার হওয়া। একজন প্রিমিয়াম দিলেন, তাকে মনে করতে হবে তিনি অসুস্থ হলে তখন তিনি পাবেন। এখন অন্যের কাজে লাগছেন।

এই স্বাস্থ্যবীমার প্রস্তাবক ও ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্যানসার ও কিডনি রোগ দেশে বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসায় প্রচুর খরচ। ইনডিভিজ্যুয়াল ইনস্যুরেন্স দিয়ে এই রোগে কাজ হবে না। যদি গ্রুপ ধরা যায়, তাহলে উপকার হবে। তখন আমরা চিন্তা করলাম, বাংলাদেশে বাইডিফল্ট একটি বড় গ্রুপ আছে মোবাইল সাবস্ক্রাইবার। প্রায় ১৫ কোটি মোবাইল ফোন সাবস্ক্রাইবারের কলরেটের ওপর একটা টাকা নির্ধারণ করে দিলে বিশাল একটা তহবিল গড়ে উঠতে পারে। সেই টাকা আদায়ে কোনও খরচও হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘ইনস্যুরেন্স করতে গেলে গ্রুপ হতে হবে এবং কম খরচে কীভাবে টাকাটা আদায় করা যায়, সেটা চিন্তা করতে হবে। আমরা ১৫ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মধ্যে ১০ কোটিকে ইফেক্টিভ ধরেছি। ১০ কোটি ইউজারের কাছ থেকে যদি মাসে ২২ টাকা করে এটা নেওয়া হয় তাহলে বছরে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আসে। এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশের ক্যানসার এবং কিডনি হাসপাতাল থেকে যারা চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের পাঁচ লাখ টাকা করে বছরে দেওয়া যায়।’

ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বীমার যেন একটা স্বচ্ছতা থাকে। টাকাটা কোনোভাবেই রোগীর মাধ্যমে দেওয়া যাবে না, সার্ভিস প্রোভাইডারদের মাধ্যমে দিতে হবে। তারপর প্রোভাইডার যখন ক্লেম করবেন তখন টাকাটা পাবেন। যদি ২২ টাকা করে সবার ওপরে ধার্য করা হয় তাহলে যারা গরিব তাদের ওপর বেশি চাপ পড়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘তাই আমরা হিসাব করেছি এই ২২ টাকাকে স্প্রেড করে কলরেটের ওপর দিয়ে দিতে। যারা নিম্ন আয়ের, তারাতো মোবাইলে বেশি কথা বলে না। যারা ব্যবসায়ী, করপোরেট বা যাদের আয় বেশি তারা বেশি কথা বলেন। ফলে কলরেটের ওপর দিলে যারা বেশি খরচ করছে তাদের বেশি দিতে হবে। তাহলে একটা প্রোগ্রেসিভ প্যাটার্ন দাঁড়াবে।’

বীমার মাধ্যমে চিকিৎসা পাওয়া প্রসঙ্গে সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন ২৫ হাজার মানুষ ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছে। বাকিরা চিকিৎসার আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এই বীমা চালু হলে আমরা কমপক্ষে প্রত্যেক রোগীর পেছনে পাঁচ লাখ টাকা করে ব্যয় করতে পারবো। যারা বীমার আওতায় অপারেশন, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি ও অন্যান্য ওষুধ পাবে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে ৬০ হাজার কিডনি রোগী চিকিৎসা নেয়। তাদের প্রতি সপ্তাহে তিন ডোজ ডায়ালায়সিস নিতে হয়। এখন দেশের যে সক্ষমতা তাতে ১৫ হাজার রোগীকে ডায়ালায়সিস দেওয়া যায়। এর জন্য প্রয়োজনীয় সিস্টেমগুলো দাঁড় করাতে হবে।’
রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হসপিটালে যখন রোগী আসবে তার রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে। এটি বায়োমেট্রিক্স বা কার্ড হবে। তিনি হাসপাতালে সেবা নিয়ে যাবেন। তার সার্ভারে তথ্য চলে যাবে। বীমার মাধ্যমে হাসপাতালকে অর্থ দেওয়া হবে।’
স্বাস্থ্যবীমার আরেক প্রস্তাবক জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিনও প্রাই একই কথা বলেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যবীমাটি এমনভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে এতে রোগী সরাসরি অর্থ পাবেন না, একইভাবে চিকিৎসার মূল্য পরিশোধ করবেন না। এতে রোগীকে কোনও হয়রানির শিকার হতে হবে না। এই বীমা চালু হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পথে একটি ধাপ এগিয়ে যাওয়া হবে।’

স্বাস্থ্যবীমার এই দুই প্রস্তাবক আরও বলেন, সরকার স্বাস্থ্য খাতের ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের প্রস্তাব মতো বীমা চালু হলে তা সবার জন্য উপকার হবে। যেহেতু এতে মোবাইল কোম্পানি জড়িত, তাই কোনও বীমা কোম্পানি এই কাজ পরিচালনা করতে পারবে না। এটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের আলাদা একটি অথরিটি গঠন করতে হবে। এর প্রধান যিনি হবেন তিনি নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবেন। যেহেতু মোবাইল কোম্পানির কাছ থেকে লেভির বিষয় আছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটা ছাড়পত্রের বিষয় আছে। মোবাইল কোম্পানির লেভি ইমপোজ করার জন্য যে স্বীকৃতি লাগবে এটার জন্য অথরিটি লাগবে। সেইসঙ্গে লাগবে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে ক্যানসার প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্র (সিসিপিআর) আয়োজিত জাতীয় ক্যানসার সম্মেলনে এই স্বাস্থ্যবীমার ধারণাটি তোলা হয়। ওই সেশনে চেয়ারম্যান হিসেবে উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির ডিন এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবায়েত বিষয়টি খুবই পছন্দ করেন। পরে সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে একটি চিঠি পাঠানা তিনি। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রস্তাবনাটি তৈরি করা হয়েছে।

মূল প্রস্তাবনাটি লিখেছেন ইন্সটিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এবং সহযোগিতা করেছেন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •