এ কে এম ইকবাল ফারুক, চকরিয়া :

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের অধিন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং এলাকায় অবস্থিত চুনতি অভয়ারণ্য ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এখন অবৈধ বসতি তৈরির হিড়িক পড়েছে। হাতি বিচরণের অন্যতম নিবিড় এলাকা চুনতি অভয়ারণ্যে গত আট বছরে অন্তত পাঁচ শতাধিক অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ব্যক্তি ও রোহিঙ্গাদের কাছে বনভুমির ওপর গড়ে তোলা এসব ছোট ছোট ঘর বিক্রি করা হয়েছে। আর এসব অবৈধ বসতিতে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন বন বিভাগের লোকজন।

স্থানীয় এলাবাবাসী জানায়, চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের কলাতলী এলাকার বাসিন্দা ৪৮ টি বন মামলা ও ছয়টি মাদক মামলার আসামি তোফায়েল আহমদের নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত অভয়ারণ্যের জায়গা দখল ও সংরক্ষিত বনের বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে। জায়গা দখল ও বৃক্ষ নিধনের অভিযোগে ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত তোফায়েল আহমদের বিরুদ্ধে বন আইনে ৪৮টি মামলা করেছে বনবিভাগ। তার নেতৃত্বে অভয়ারণ্যের চকরিয়া অংশের কলাতলী এলাকায় (আজিজনগর অভয়ারণ্য বিটের আওতাধীন) তিন শতাধিক অবৈধ বসতি গড়ে তোলে এলাকার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বার্মাপাড়া’ নামে। এই পাড়ায় গড়ে তোলা অবৈধ বসতিগুলোতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন। নির্মিত এসব অবৈধ বসতি থেকে ঘরপ্রতি ৫০ হাজার টাকা থেকে এক লাখ টাকা করে নিয়েছেন। এছাড়া আরও নতুন বসতি তুলে দিতে অনেকের সঙ্গে লিখিত চুক্তিপত্রও করেছেন তিনি। বনবিভাগ, প্রশাসন ও সাংবাদিক ম্যানেজের দায়ভারও তার নিজের হাতে। সংরক্ষিত বনভুমিতে বসবাসকারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে ঘর কেনার কথাও স্বীকার করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অভয়ারণ্যের ভেতর কলাতলী এলাকায় তোফায়েলের ঘরের উত্তর পাশে টিনের ঘেরা ও ছাউনি দিয়ে বসতঘর তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর ঘরের দক্ষিণ পাশে আরেকটি ঘর তৈরি করতে মাটি ও গাছ কাটা হয়েছে। গাইনাকাটা, ভিলেজার পাড়া, রোডপাড়া, সংরক্ষিত বনের কোরবানিয়া ঘোনা, চেয়ারম্যান পাড়া, ছোবাইন্যার ঘোনা ও চুনতি বিটের সুফীনগর, বার্মা পাড়া ও ল্যাঙ্গা হাসান পাড়াতে অন্তত তিন শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার অবৈধ বসতি গড়ে তোলে বসবাস করছেন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে গিয়ে ঘর কিনে বসবাস করছেন আরও দুই শতাধিক পরিবার। রোহিঙ্গারা বনের গাছ যেমন ধ্বংস করছে, তেমনি নানা অপকর্মেও জড়িয়ে পড়ছে। অবৈধ বসবাসকারীরা বলেন, বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের টাকা দিয়ে তাঁরা এখানে বসবাস করছেন। তবে যাঁদের কাছ থেকে ঘর ও বনভুমি কিনেছেন, প্রকাশ্যে তাঁদের নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন তাঁরা। এসব প্রভাবশালীর নাম বললে তাঁরা পাহাড়ে থাকতে পারবেন না বলেও জানান।

বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন, তোফায়েল টাকা নিয়ে রোহিঙ্গাদের বনের মধ্যে বাড়ি করে দেন। গত বছরের ৪ এপ্রিল একটি বনমামলায় তোফায়েলের দুই বছরের সাজা হয়। ওই বছরের আগস্ট মাসে চিফ জুড়িশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আপীল করলে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন এবং জেল থেকে ছাড়া পান। এরপর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে অবৈধ বসতি স্থাপন ও গাছ কাটা শুরু করেন।

এ ব্যাপারে আজিজনগর অভয়ারণ্যের বর্তমান বনবিট কর্মকর্তা আজহার আলী বলেন, ‘তোফায়েলের নেতৃত্বে আরও কিছু ব্যক্তি অভয়ারণ্য ধ্বংস করছেন। টাকা নিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন, অবৈধভাবে বনভূমি দখল ও বিক্রি এবং সংরক্ষিত বনের গাছ কাটছে চক্রটি। তবে বনভুমি দখল ও গাছ কাটা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।’

অভিযোগের বিষয়ে তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘বনদখল, বনভুমি বিক্রি ও অবৈধ বসতি স্থাপনের কাজ ছেড়ে দিয়েছি পাঁচ বছর হচ্ছে। এখন যেসব বসতি গড়ে উঠছে, তা স্থানীয় কাশেম ও তাঁর আত্মীয়রা করে দিচ্ছেন। আমি এখন ফার্নিচার ব্যবসা করি। আমার গাছ লাগলে অন্য মানুষ থেকে কিনে নিই। আমি খুব কষ্টে কাজকর্ম করে সংসার চালাই।’ তোফায়েল তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বন মামলাগুলো মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।

অবৈধ বসতি উচ্ছেদের বিষয়ে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, বনবিভাগের সঙ্গে কথা বলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংরক্ষিত বন ও অভয়ারণ্যের ভেতর গড়ে উঠা অবৈধ বসতি উচ্ছেদে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •