এম, রিদুয়ানুল হক, কক্সবাজারঃ

মেধা অদৃশ্য। কালের বিবর্তনে তা ফুটে উঠে আবার লুকিয়ে থাকে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কালো হাতের ইশারায় ঐ মেধাকে সাময়িক স্তব্ধ করে রাখে কিছু মানব। তাও আবার স্ব-কৌশলে জ্ঞানী মানুষেরা করে থাকে। যার স্বচিত্র কৌশল দেখে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার কাছে পরাজিত হতে হয়। এই ধরনের আচরণ মোটেও মানুষের বৈশিষ্ট্যের তালিকায় অন্তভূর্ক্ত হতে পারে না। সম্মানিত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এটি মোটেও প্রযোজ্য নয়।

নাম মো. ওয়াসিফ এজাহার। তার পিএসসি রোল ৮৮৫৯। তার পিতার নাম অধ্যাপক নাছির উদ্দিন। তিনি চকরিয়া মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ক্যামেস্ট্রি বিষয়ের অধ্যাপক। ওয়াছিফ এজাহার ক্লাসের ফাস্ট বয়। সে প্রতিটি ক্লাসে মেধা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ২০১৮ সালে চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠ হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। ফলাফলে দেখাগেছে এ+ পেয়েছে সে। তার প্রাপ্ত নাম্বার ৫৫৮। যা তার জীবনে প্রথম কম নাম্বার। প্লে থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় তার সফলতা দৃশ্যমান। যা প্রতিটি কর্তৃপক্ষের কাছে ডকুমেন্ট আকারে লিপিবদ্ধ রয়েছে। যার জীবনে প্রতিটি বিষয়ে ৯৭/৯৮ এর নীচে কোনো নাম্বার পায়নি, সে পিএসসিতে এত কম নাম্বার পাবে তা কিন্তু রহস্য জনক!

পিএসসি নাম্বারপত্র হাতে আসার পর দেখা গেল বাংলা বিষয়ে ৮৪, বাংলাদেশ বিশ্বপরিচয় বিষয়ে সে পেয়েছে ৮৭ নাম্বার। যা দেখে তার পুরো পরিবার ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হতবাক। শুরু হলো নিয়ম মতো পুন:নিরীক্ষণের আবেদন। আবেদন করা হলো। অপেক্ষা পুনরায় ফলাফলের জন্য। কিন্তু এর ফাঁকে বসে নেই তার অভিভাবক ও শিক্ষক। বহু গভীরে যেতে সক্ষম হয়েছে তাঁরা। বাংলা ও বাংলাদেশ বিশ্বপরিচয় বিষয়ের উত্তরপত্রটি এমনভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে যে, কেউ দেখলে সহজেই গালি দিতে দেরি করবে না। সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের মান ৩০। তাকে দেয়া হলো আন্দাজে ১৭ নাম্বার। অর্থাৎ ১৩ নাম্বার কম দেয়া হলো। আসলে সে পাবে ৩০ এর মধ্যে ৩০। বাংলাতেও আরো খারাপ অবস্থা। বাংলা খাতা যিনি মূল্যায়ণ করেছেন হয়তঃ তিনি বাংলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না।

পুন:নিরীক্ষণের ফলাফলে দেখা গেল, ফলাফল অপরিবর্তীত। অভিভাবকের টেনশন আরো বেড়ে গেল। এখন বৃত্তির ফলাফলের অপেক্ষায় তার পরিবার। বৃত্তির ফলাফল প্রকাশ হলো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ট্যালেন্টপুল তো দূরের কথা, সাধারণ গ্রেডেও বৃত্তি পায়নি সে। কিন্তু একই নাম্বার পেয়ে অন্য শিক্ষার্থীরা সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করে। তাহলে একজন উপযুক্ত মেধাবী ছাত্রের মেধার মৃত্যুর দায়ভার কে নেবে?

খবর নিয়ে জানা গেছে, পুন:নিরীক্ষণে যথাযথ নিরীক্ষণ করেননি কর্তৃপক্ষ। শুধুমাত্র উত্তরপত্রে দেয়া নাম্বারগুলো যোগ করেছেন। বাকিটা আত্মগোপনে! রহস্যজনক হলেও সত্য যে, এমন কিছু শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে, যারা ক্লাসে পাশ করা কষ্টসাধ্য। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, শিক্ষার্থীর মেধা মূল্যায়ণ করা হয় উত্তরপত্র দেখে নাকি চেহারা দেখে? অবশ্যই সঠিক উত্তর হলো- উত্তরপত্র দেখে। আমার প্রশ্ন কিন্তু ঐখানে। অবশ্যই উত্তরপত্র মূল্যায়ণ যথাযথ হয়নি। আমি আবারো বলছি, চ্যালেঞ্জ করে বলছি- মো. ওয়াসিফ এজাহারের উত্তরপত্র যথাযথ মূল্যায়ণ করা হয়নি।

যদি আমার কথা বিশ্বাস না হই, তাহলে তদন্ত টিম গঠন করে দেখুন। সেখানে যদি আমার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে যথাযথ শাস্তি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত আছি।

এবিষয়ে চকরিয়া উপজেলা সহকারি শিক্ষা অফিসার আনোয়ারুল কাদের’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন- আসলে উত্তরপত্র মূল্যায়ণ করেন বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাঁদেরকে যথাযথ উত্তরপত্র মূল্যায়ণের নির্দেশ দেয়া আছে। তারপরও কিছু কিছু শিক্ষক উত্তরপত্র মূল্যায়ণে অবহেলা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এবিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এবিষয়টি জানানো হয়েছে। তবে চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের ফাস্টবয় ওয়াসিফ এজাহার বৃত্তি পায়নি শুনে আমি নিজেই মর্মাহত হয়েছি। তিনি স্বীকার করে বলেন- কিছু কিছু উত্তরপত্র মূল্যায়ণ যথার্থ হয়নি। যার কারণে মেধার মৃত্যু হয়েছে বলা যায়।

এবিষয়ে ওয়াসিফ এজাহারের পিতা অধ্যাপক নাছির উদ্দিন বলেন- আমি জীবনে অনেক উত্তরপত্র মূল্যায়ণ করেছি এবং দেখেছি। কিন্তু পিএসসি খাতার মূল্যায়ণটা আমার মনকে মর্মাহত করেছে। তিনি বলেন বাংলা ও বাংলাদেশ বিশ্বপরিচয় বিষয়গুলো যদি সঠিক মূল্যায়ণ করা হতো তাহলে আমার ছেলে মিনিমাম ৯৭/৯৮ নাম্বার অর্জন করতো। ৫৫৮ নাম্বার পেয়ে এক শিক্ষার্থী সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাবে, আরেক শিক্ষার্থী পাবে না, এটি কেমন আইন। তিনি পুনরায় খাতা মূল্যায়ণের জন্য কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন – একই নাম্বার পেয়ে অনেকে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে, কিন্তু আমার ছেলে বৃত্তি পাইনি। এটাও কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ!

চকরিয়া কোরক বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক নুরুল আখের জানান- এটি কোন ধরনের ফলাফল? মেধাবীরা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হবে আরা কম মেধাবীরা বৃত্তি পাবে, এটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন- প্রতিবারেই আমার বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ মেধাবীরা বৃত্তি পেয়ে থাকে, কিন্তু ২০১৮ সালের বৃত্তির ফলাফলে ক্লাসের ১, ২, ৩ সিরিয়াল মেধাবীরা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এ ফলাফল আমাকে মর্মাহত করেছে। এই ধরনের উত্তরপত্র মূল্যায়ণ শিক্ষার্থীদের মেধা ধ্বংস করবে। উত্তরপত্র পুন:মূল্যায়ণ করা জরুরি মনে করছেনন তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •