– এইচ. এম. ই. রিমন

বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার সদর, রামু, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, টেকনাফ উপজেলায় এবং চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার ৬৭,৭৫১ একর জমিতে ৩৪,৫৫৩ জন চাষি সৌর পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন করছে। জাতীয় অর্থনীতিতে লবণ শিল্পখাত প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার অবদান রাখছে। বাংলাদেশের প্রায় ১০-১৫ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লবণ শিল্পের উপর নির্ভরশীল।

লবণ শিল্পের ইতিহাস অনেক পুরানো, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পনির শাসনের প্রথম দিকে চট্টগ্রামে ৭৯-৯৯ হাজার মণ লবণ উৎপাদিত হতো। তখন কোম্পানির কর্মচারীরা চট্টগ্রামে উৎপাদিত লবণের ব্যবসা করত। পরবর্তীকালে লিভারপুর থেকে লবণ আমদানির কারণে প্রকৃতিজাত এই শিল্পটি ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটিশ সরকার সামুদ্রিক লবণ উৎপাদন করা বেআইনি ও দন্ডযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করে এবং স্বদেশী লবণের উপর অতিমাত্রায় কর আরোপ করায় এই শিল্প বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামের বহু মুলঙ্গী জীবিকার তাগিদে লুকিয়ে লবন চাষ করতে গিয়ে ধরা পড়ে শাস্তিও ভোগ করত। এভাবে নির্যাতন চালিয়ে চট্টগ্রামের প্রাচীন লবণ শিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছিল।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও দেশীয় লবণ শিল্প নানা রকম হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। লবণ মাঠের দালাল আর মিল মালিকদের বিদেশ হতে লবণ আমদানির ফলে মাঠের চাষীরা কখনও ন্যায্য মূল্য পায়না। লবণ চাষীরা প্রচন্ড গরমে সারাদিন শরীরের ঘাম ঝরিয়ে প্রাকৃতিক সূর্যালোকের উপর নির্ভর করে লবণ উৎপাদন করে সারাদেশের মানুষের লবণের চাহিদা পূরণ করছে। তারপরও মাঠের দালাল প্রভাবিত বাজার ব্যবস্থার কারণে চাষীরা কখনও ন্যায্য বাজার মূল্য পাচ্ছে না।

লবণ মাঠের দালালরা জমির মালিক হতে অগ্রিম জমি লিজ নিয়ে নেই। এভাবে প্রত্যেক দালাল ১০০-২০০ কানি পর্যন্ত লবণ মাঠ নিজের দখলে রাখে। প্রকৃত লবণ চাষীদের এসব দালাল হতে জমি নিয়ে আরও উচ্চ মূল্যে জমি নিয়ে চাষ করতে হয়। চাষীরা সারা শরীরের ঘাম মাটিতে ঝরিয়ে লবণ উৎপাদন করে ব্যবসায়ীদের কাছে লবণ বিক্রি করে দালাল নিয়ন্ত্রিত বাজার মূল্যে। প্রতি মণ লবণের মূল্য ২০০ টাকা হলে দালালি ফি হয় ১০০ টাকা, দালালি বানিজ্যের সুবাধে কিছু অসাধু লোকজন কোটি টাকার মালিক হলেও জমির চাষীরা দাদনের টাকা দিতেই হিমশিম খায়। চাষীরা কখনও উন্মুক্ত বাজারের ন্যায্য মূল্য পায়না। মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব দালালরা গ্রামীণ জনপদে থাকার কারণে সরকারকে বরাবরই ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আসছে।

লবণ শিল্পের উন্নয়ন আর নিয়ন্ত্রণের জন্য কক্সবাজার বিসিক কার্যালয় দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও লবণ মাঠে দালালি প্রথা বন্ধে কখনও পদক্ষেপ নেয়নি। দালালি প্রথার কারণে চাষীদের জীবনযাত্রার দিন দিন করুণ হয়ে উঠেছে। লবণ চাষীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিসিকের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নতুবা আদালতে রিটের মাধ্যমে দালালি তথা মহাজনি পদ্ধতি থেকে চাষীদেরকে বাঁচাতে হবে।

তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চাষীরা অভিযোগ করছে অতি লোভী মিল মালিকরা বিদেশ হতে লবণ আমদানির করছে অথচ বিসিকের গত বছরের তথ্য অনুযায়ী দেশে লবণের কোন ঘাটতি নেই । এরই প্রেক্ষিতে গত বছরের সরকারি সিদ্ধান্ত মতে স্থানীয় চাষীদের স্বার্থে লবণ আমদানি বন্ধ রাখবে। দেশীয় লবণ উৎপাদন আর সামগ্রিক চাহিদার মাঝে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আর মিল মালিকদের সিন্ডিকেট অধিক মুনাফার আশায় সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে সব সময় লবণ আমদানির ধান্দায় থাকে।

রেফারেন্সঃ উইকিপিডিয়া

ফ্রিল্যান্স লেখক – এইচ. এম. ই. রিমন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •