টেকনাফের উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর, স্ত্রী আমিনা ও রহিম আসামি 

রাশেদুল মজিদ:

টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও তালিকাভূক্ত ইয়াবা কারবারি জাফর আহমদ, তার স্ত্রী আমিনা খাতুন ও ইয়াবা কারবারি টেকনাফের অলিয়াবাদ এলাকার আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় গতকাল সোমবার রাতে মামলা তিনটি দায়ের করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চট্টগ্রাম-২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারি পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন। তিনটি মামলার মধ্যে একটিতে টেকনাফ উপজেলার লেংগুর বিল এলাকার মৃত সুলতান আহমদের পুত্র জাফর আহমদ, অপর একটি মামলায় জাফর আহমদের স্ত্রী আমিনা খাতুন এবং আরেকটি মামলায় টেকনাফের অলিয়াবাদ এলাকার মৃত আমির হোসাইনের পুত্র আবদুর রহিমকে আসামী করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ কর্তৃক দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার ১০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করা হয়। এছাড়া একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার উপর অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪ কোটি ৯০ লাখ ৬৯ হাজার ১২৪ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে অর্জনপূর্বক ভোগ দখলে রেখেছেন।
এতে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
২০১৭ সালের ৩০ জুলাই জাফর আহমদের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ২ কোটি ৬১ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬৪ টাকার স্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য প্রদান করেছেন। কিন্তু সম্পদ বিবরণী যাচাইকালে তার নামে ৬ কোটি ২৩ লাখ ৮ হাজার ৭৩৫ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭১ টাকার স্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন।

এছাড়া দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে তিনি নিজ নামে ৩৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দেন। সম্পদ বিবরণী যাচাইকালে তার নামে ৫১ লাখ ২৫ হাজার ৬৩৯ টাকার অস্থাবর সম্পদ পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে তিনি ১৭ লাখ ১০ হাজার ৬৩৯ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন। অর্থাৎ দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ঘোষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ২ কোটি ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার ৩৬৪ টাকা। তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইকালে তার নামে প্রাপ্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৪ টাকা। এক্ষেত্রে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার ১০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

সংগৃহীত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি ২০০১-০২ কর বছর থেকে ২০১৭-১৮ কর বছর পর্যন্ত বেতন ভাতা, গৃহ সম্পত্তির আয়, কৃষি আয়, আমদানী ব্যবসার আয়, দান, ঋণ গ্রহণ ও জমি বিক্রি বাবদ সর্বমোট ২ কোটি ৫০ লাখ ৬ হাজার ৮৯৫ টাকা বৈধভাবে আয় করেছেন। এছাড়া তার পারিবারিক ব্যয়, কর পরিশোধ, জমি ক্রয়, গ্রহণকৃত ঋণের সুদ পরিশোধ ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ ৬৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৫ টাকা খরচ করেছেন। অর্থাৎ তিনি ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৪ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন এবং ৬৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৪৫ টাকা পারিবারিক ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় করেছেন। তার ব্যয়সহ মোট অর্জিত সম্পদের পরিমান ৭ কোটি ৪০ লাখ ৭৬ হাজার ১৯ টাকা। দুদকের প্রধান কার্যালয় গত ১৯ মার্চ মামলা রুজুর অনুমোদন দেন।
একই সাথে জাফর আহমদের স্ত্রী আমিনা খাতুন ২৬ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্য অসৎ উদ্দেশ্যে গোপনপূর্বক মিথ্যা তথ্য প্রদান করে এবং ১১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫ টাকার অস্থাবর সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে অর্জনপূর্বক ভোগ দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। আমিনা খাতুনের স্বাক্ষরিত সম্পদ বিবরণীতে তার পক্ষে তার স্বামী জাফর আহমদ গত ৩০/৭/২০১৭ ইং দুদক কার্যালয়ে দাখিল করেন। তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে তিনি কোনো স্থাবর সম্পদ প্রদর্শন করেননি। তার দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণ যাচাইকালে তার নামে কোনো স্থাবর সম্পদ থাকার তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে নিজ নামে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ২৯৮ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ অর্জনের ঘোষনা দেন। কিন্তু দাখিলকৃত সম্পদ যাচাইকালে তার নামে ৩০ লাখ ৩ হাজার ৩২ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধেও একটি মামলা দায়ের করা হয়।
এছাড়া টেকনাফ পৌরসভার অলিয়াবাদ এলাকার মৃত আমির হোসাইন এর পুত্র আবদুর রহিম ও তার ভাই নুরুল হোসাইন এর বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার মাধ্যমে জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে অনুসন্ধানে নামে দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আবদুর রহিমের নিজ নামে ১ কোটি ১০ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬০ টাকার স্থাবর এবং ৬০ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। উক্ত সম্পদ অর্জনের বিপরীতে তার কোনো বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় মামলা রুজু করা হয়। যোগাযোগ করা হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম-২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারি পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন মামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মার্চ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি আবারও চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করে হেরে যান। এখনও নতুন নির্বাচিত চেয়ারম্যান নুরুল আলম শপথ নেননি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •