মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

কক্সবাজার জেলার ৬ টি উপজেলাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারমধ্যে-উখিয়া উপজেলায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী আগেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। অবশিষ্ট ৫ টি উপজেলা যথাক্রমে চকরিয়া, টেকনাফ, রামু, পেকুয়া ও মহেশখালীতে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের শোচনীয়ভাবে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন একইদলের মনোনয়ন বন্ঞ্চিত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তারমধ্যে-গত ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত চকরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন-মনোনয়ন বন্ঞ্চিত বিদ্রোহী প্রার্থী ফজলুল করিম সাঈদী। রোববার ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত টেকনাফ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীকে হারিয়ে চেয়ারম্যান হয়েছেন-বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুল আলম, রামু উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী রিয়াজউল আলমকে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন-বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল সরওয়ার কাজল, মহেশখালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হোসাইন ইব্রাহিমকে হারিয়ে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ বাদশা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ কক্সবাজারের যে ৫ টি উপজেলায় নির্বাচন হয়েছে সে ৫ টি উপজেলায় একই দলের মনোনয়ন বন্ঞ্চিত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন-আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীদের এরকম ভরাডুবি’র বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রাজনৈতিক বোদ্ধা বলেছেন-নৌকা প্রতীকের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নেমেছে, নাকি আওয়ামীলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্ধ, নাকি প্রার্থী মনোনয়নে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, নাকি অন্য কোন কারণ-সেটা এখন বলা কঠিন। মাঠে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীদের গ্রহনযোগ্যতার চেয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে গায়েবি (!) মামলা, হুমকি, গ্রেপ্তার সহ বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ডের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে। তবে ক্রমান্বয়ে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সংস্কৃতি উঠে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়ছে। ভোটারেরা নির্বাচন নিয়ে দিন দিন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অথচ এদেশে নির্বাচন মানেই উৎসবমূখর পরিবেশ, সেটা ছিল ভোটারদের স্বভাবজাত অভ্যাস। এজন্য, নির্বাচনমূখী গণতন্ত্র একেবারই অনুপস্থিত। অথচ গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম উপাদান হলো-সাধারণ নির্বাচন। তাই ভোট কেন্দ্রে গুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি একেবারে হতাশাব্যন্ঞ্জক। তার মতে, এজন্য শাসক দল ও রাষ্ট্রযন্ত্রই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। তিনি বলেন-ক্ষমতায় থেকেও প্রশাসন চাইলে যে, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে, সেটা কক্সবাজার জেলার উল্লেখিত ৫টি উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে প্রমানিত হয়েছে। তবে তার মতে, সার্বিক পরিস্থিতিতে বর্তমান ফলাফলে আগামীতে অনুষ্ঠেয় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন গুলোতে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশ চাঙ্গা হবেন এবং আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা প্রার্থীরা নিঃসন্দেহে হতাশ হবেন, একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। এছাড়া “নৌকা প্রতীক পাওয়া মানেই, নিশ্চিত নির্বাচিত হওয়া” ভোটারদের মাঝে এ ধারণাও এখন পাল্টে গেছে।

এবিষয়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন-উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হচ্ছে স্থানীয় সরকারের একটি ধাপের নির্বাচন। এখানে প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তির গ্রহনযোগ্যতা, প্রার্থীর স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তা, সাধারণের মাঝে প্রার্থীর ইমেজ, প্রার্থীদের নির্বাচনী কৌশল ইত্যাদি-কাজ করেছে বেশী। তিনি বলেন-নির্বাচনে কে জিতেছে, কে হেরেছে বড় কথা নয়-সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন হয়েছে, এটাই বড় কথা। নির্বাচনে কোন অযাচিত হস্তক্ষেপ নাহওয়ায় এ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের মতামতের সঠিক প্রতিফলন ঘটেছে। কারণ, আওয়ামীলীগ একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসাবে সবসময় সর্বস্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হউক এটাই কামনা করে। আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও দলের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগতভাবে সাংগঠনিক প্রদক্ষেপ না নেয়ায় সবাই অনেকটা স্বাভাবিক পরিবেশে নির্বাচন করেছে। কেন্দ্রীয়ভবে বিদ্রোহী দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যাপারে কঠোর নাহয়ে নমনীয়ভাব দেখানো হয়েছে। তাছাড়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরাতো সকলেই আওয়ামীলীগের নেতা। তাদেরে তো দল থেকে কখনো অব্যাহতি দেয়া হয়নি। তাই এখানে দলের হারাবার কিছু নেই। বরং এ নির্বাচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র চর্চা, স্বাধীন, শান্ত, নির্মল, সন্ত্রাস ও ভীতিমুক্ত পরিবেশে তাদের মতামতের যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থেকেও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেয়নি-এটাই আমাদের বড় সফলতা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •