cbn  

সালাহউদ্দিন কাদের :

ধর্মীয় উগ্রতা ও ধর্মান্ধতা কতটা ভয়ংকর হতে পারে তার উপযুক্ত নিদর্শন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে নামাজরত মুসল্লীদের উপর নির্বিচারে হামলা। যার খুব কাছেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্র‍্যাকটিস করছিলো এবং এই মসজিদেই আজ তাদের জুমার নামাজ পড়ার কথা ছিলো। ভাগ্যক্রমে আমরা বিশাল এক ট্র‍্যাজেডি থেকে বেঁচে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

ঘটনার বিশদ বর্ণণাঃ

অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত ব্রেন্টন টেরেন্ট নামক শ্বেতাঙ্গ বন্দুকধারী ৬টি অটোমেটেড রাইফেল ও শটগান নিয়ে গাড়ি চালিয়ে ঢুকে পড়ে ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদে। তার নিজের করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে পূর্ববর্তী বিভিন্ন হামলাকারীর নাম লেখা রাইফেল হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার হেডফোনে চলছে আর্মি সং।

মসজিদের দরজায় একজন মুসল্লীকে দেখে “চলুন, পার্টিটা শুরু করা যাক” বলে ছুঁড়তে শুরু করলো বৃষ্টির মতো গুলি। ভেতরে ঢুকলো সে। একে একে ঝাঁঝরা করতে থাকে নিরীহ মুসল্লীদের। কেউ কেউ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়েন। বন্দুকধারী সন্ত্রাসী সেই অবস্থাতেই চালিয়ে যায় একের পর এক গুলি। একে একে সবার মৃত্যু নিশ্চিত করে সে বেরিয়ে আসে।

গেট দিয়ে বেরোনোর সময় এক মহিলাকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখে সে গাড়ি থামিয়ে জানালার কাচ নামিয়ে গুলি করলো। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর পৈশাচিক হাসি হেসে আফসোসের সুরে বললো, “আরো একটা ম্যাগাজিন রয়ে গেছে। আরো কাফেরদের হত্যা করতে পারলে ভাল হতো। যতদিন শ্বেতাঙ্গরা বেঁচে আছে, ততদিন এই ধর্মান্তরিত বেঈমানরা বেঁচে থাকতে পারবে না। আমাদের মাটিতে আমরাই থাকব। আমাদের মাটি কাউকেই হতে দিব না।”

জঙ্গির সংজ্ঞানুসারে, এই হামলাকারীকে সন্ত্রাসী বা বন্দুকধারী বলার সুযোগ নেই। সে একজন জঙ্গি। কারণ জঙ্গি তাদেরকেই বলা হয়, যারা কোন একটি ধর্মীয় মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নির্বিচারে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সেই হিসেবে আল-কায়েদা, আল-শাবাব, আর এসএস, শিবসেনা, আইএস, তালেবান, জেএমবি, হোয়াইট সুপ্রিম্যাসিস্ট, উগ্র ইহুদি, নাৎসি, উগ্র ডানপন্থী এরা সবাই জঙ্গি। কারণ এরা রক্তপাতের মাধ্যমে খেলাফত বা নিজ নিজ মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী।

মসজিদে হামলার আগে এই কুখ্যাত জঙ্গি টুইটারে প্রায় ৮৭ পৃষ্ঠার একটি মেনিফেস্টো শেয়ার করে। সেখানে সে ইউরোপে খ্রিষ্টান ছাড়া অন্য কারো বসবাসের অধিকার নাই বলে ঘোষণা করে। তার ভাষ্যমতে, ‘যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে, তারা বেঈমান। তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নাই। নরওয়ের অসলো শহরে ২০১১ সালে এন্ডার্স ব্রেইভিক নামক একজন শ্বেতাঙ্গ দেশপ্রেমিক ৭৭জন বেঈমানকে হত্যা করেছিল। সে আমার আইডল। আমি ডাইলান রুফ এর লেখা পড়ে বেঈমান হত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়েছি। এছাড়াও আমি সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ হয়েছি ক্যান্ডেইস ওয়েন্স এর বক্তৃতা শুনে। ভদ্রমহিলা যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমর্থক, খুবই বিজ্ঞ মহিলা, প্রকৃত দেশপ্রেমিক।”

এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এই হামলা ধর্মীয় প্রচন্ড বিদ্বেষ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এই ভয়াবহ হামলাই প্রমাণ করেছে, জঙ্গিবাদের কোন ধর্ম নেই। শুধু মুসলিমদের একটা অংশই যে জঙ্গি না, এটা তার আরও জোরালো প্রমাণ।

শান্তিপূর্ণ পৃথিবী চাইলে প্রয়োজন সহাবস্থান। উগ্রতা কখনোই শান্তি আনেনি। অতীত ইতিহাসও তাই বলে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আমাদের বসবাস করতে হবে। স্বর্গ বা জান্নাত পাওয়ার আশায় নিরীহ মানুষ খুন করা নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা পছন্দ করেন না। যতদিন এই পৃথিবীর সব মানুষকে আমরা মানুষ বলে গণ্য করবো না, ততদিন এমন ঘৃণা-বিদ্বেষ ও নরকের অশান্তি চলতেই থাকবে।

পরিশেষে, কাপুরুষোচিত এই হামলায় হতাহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা এবং আমার লেখা ছোট্ট একটি কবিতা দিয়ে এই লেখাটির ইতি টানছি….

মানুষ আমি, মানুষ তুমি
মানুষ আমরা সবে,
জাতে-ধর্মে কেন এ বিবাদ
কেন কেউ কেউ অস্পৃশ্য রবে?

স্রষ্টা যদি একজনই হয়
সৃষ্টিও সব একজনেরই,
কেউ বুকে বা কেউ পিঠে নয়
সবারই তিনি অন্তর্যামী।

অনিশ্চিত এই ধরণীতে
চাই না সংঘাত-রক্তপাত,
সাম্য-শান্তি আসুক নেমে
ঘৃণা-বিদ্বেষ নিপাত যাক।

লেখকঃ সালাহউদ্দিন কাদের
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •