ইমাম খাইর, সিবিএন:
কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ শাখা (এলএ) কেন্দ্রিক চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে জেলা প্রশাসন। প্রাথমিকভাবে ৩২ দালালের একটি তালিকা প্রশাসনের হাতে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (১২ মার্চ) ওই তালিকার চিহ্নিত ৪ দালালকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছে জেলা প্রশাসন।
মহেশখালীর কালারমারছড়ার ঝাপুয়া মারাক্কাঘোনা এলাকার মৃত নজির আহমদের ছেলে খোরশেদ আলম ও হোয়ানক হাবিরছড়া এলাকার ছব্বির আহমদের ছেলে মো. ইব্রাহিমকে ২০ দিন করে, কালারমারছড়ার নুনাছড়ির এলাকার মকবুল আহমদের ছেলে রকি উল্লাহ রকি ও মাতারবাড়ির মাইজপাড়া এলাকার মৃত জাকের আহমদের ছেলে আবদুল কাইয়ুমকে ১০ দিন করে সাজা দেয়া হয়েছে। সেই সাথে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১২ মার্চ) রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ সাজা প্রদান করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেলিম শেখ।
এর আগে এই চার দালালকে জেলা আদালত ভবন সংলগ্ন এলএ অফিস থেকে আটক করা হয়। এসময় দিদারসহ আরো ৫ জন দালাল পালিয়ে গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা নিয়ে বিভিন্ন দালালালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অধিগ্রহণ শাখাকে দালাল ও সুভিধাভোগিমুক্ত করতে প্রশাসন অভিযান শুরু করেছে।

তিনি বলেন, দন্ডবিধি ১৮৬০ সালের আইনের ১৯৬ ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীকে সরকারি কর্ম সম্পাদনে বাধা প্রদান করায় ৪ দালাল আটক করে সাজা দেওয়া হয় জানিয়ে মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এল,এ শাখায় দালাল বা ফড়িয়াদের উৎপিড়ন বেড়ে যাওয়ায় কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে তাদের তালিকা করা হয়, এতে কিছুদিন দালালদের উৎপাত কমে গিয়েছিল। কিন্তু ইদানিং দালালদে উৎপাত আবারো বেড়ে গেছে।

১২ মার্চ সন্ধ্যায় উক্ত দালালরা এল শাখায় কর্মরত কাননগো,সার্ভেয়ারদের কাজে বাধা প্রদান করছিল এমন খবরে তাৎক্ষনিক সেখানে দিয়ে সেখানে গিয়ে তাদের আটক করতে সক্ষম হই। এ সময় আরো কয়েকজন দালাল পালিয়ে যায়। দালাল বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

সংশ্লিষ্ট একটি সুত্রে জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণ শাখা কেন্দ্রিক ৩২ জন চিহ্নিত দালালের তালিকা প্রশাসনের কাছে জমা আছে। ইতোপূর্বে এরকম দালালের একটি তালিকা জেলা প্রশাসক ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার দেওয়ালে টাঙিয়ে দেয় জেলা প্রশাসন।
সুত্রের দাবী, ওই তালিকার বাইরেও আরো অনেক দালাল রয়ে গেছে। যারা আদালত প্রাঙ্গন ও আশপাশের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল কেন্দ্রিক অফিস গড়ে তুলেছে। দালাল সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে ভূমিহারা মানুষদের কমিশন দিতে হচ্ছে। অবশেষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে ভুক্তভোগিরা। শুধু দালাল কেন, এলএ অফিসে কর্মরত অনেক বড় কর্তাও কমিশন বানিজ্যে সরাসরি জড়িত। যাদের নির্দিষ্ট কমিশন না দিলে ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয় বলে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ।
খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, দালাল, প্রতারক, ঠকবাজচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার (এলও) কার্যালয়। এলও অফিসকেন্দ্রীক গড়ে ওঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। আদালতপাড়ার আশপাশে গড়ে ওঠেছে দশটিরও বেশী দালাল অফিস। ওখান থেকে নিয়ন্ত্রণ হয় দালালিপনা। অগ্রিম ৩০% টাকা কমিশন দিলেই মেলে ক্ষতিপূরণের চেক। আর এই কমিশন বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন এলও অফিসের পিয়নসহ কর্মরত কয়েকজন। সেই তালিকায় কানুনগো-সার্ভেয়ারও রয়েছে। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে জমির মূল মালিকরা। অন্যথায় আটকিয়ে রাখা হয় ক্ষতিপূরণের চেক। মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প বাস্তবায়নে এসব লঙ্কাকান্ড চলছে। রেল লাইনের ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েও একই অভিযোগ। হয়রানী থেকে রেহায় চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদনের স্তুপ পড়েছে ভুক্তভোগীদের। দালালরা কখনো এলও অফিসের স্টাফ, আবার কখনো এডিসি রেভিনিউর আস্থাভাজন লোক পরিচয় দেয়। সুযোগ বোঝে সরকারী দলের পরিচয় দিয়েও চলে।
অনুসন্ধানে শহরে অন্তত ১১টি দালাল অফিসের সন্ধান মেলেছে। কক্সবাজার আদালত ভবনের পূর্ব পাশে (আইন কলেজের উত্তরে) হোটেল মৌসুমিতে রয়েছে খোরশেদ আলম সিন্ডিকেটের অফিস। লালদীঘিরপাড়স্থ ইডেন গার্ডেন সিটির নীচ তলার একটি অফিস নিয়ন্ত্রণ করে রনি, মোস্তাফিজ, শফিক, হোছন, মোর্শেদ মেহেদী। ঢাকা হোটেলে আবুল হাশেম, সাদ্দাম, হেলালের অফিস। সাথে রয়েছে আরো কয়েকজন দালাল। ঝাউতলায় অফিস করেছে সাহাব উদ্দিন, হাজি ফরিদ, আবু ছালেক মামুন সিন্ডিকেট।
কস্তুরাঘাট সংলগ্ন হোটেল গার্ডেনের ১ নং কক্ষে ইব্রাহিম, আমান উল্লাহ সিন্ডিকেট অফিস। হোটেল এম. রহমানে খোরশেদ আলম সিন্ডিকেট, শহীদ সরণিস্থ হোটেল কোহিনূর-এ রমিজ, মতিন, আসাদ উল্লাহর অফিস। বদর মোকাম সড়কে বাবর চৌধুরী ও দিদারের অফিস। দালাল মুসা, হেলাল ও মৌলভী মোর্শেদের অফিস হলিডে মোড়ের হোটেল এলিন পার্কে। হোটেল হলিডে-তে অফিস রয়েছে অলিদ চৌধুরী, ঢাকার আহাদ, মিঠুনের। লালদিঘী পূর্বপাড়ের পূরাতন এসআলম কাউন্টারের জমিতে নির্মিত কক্সসিটি সেন্টারেও সম্প্রতি দালালের অফিস গড়ে উঠেছে। এছাড়া বিভিন্ন বাসাবাড়ী কেন্দ্রীক ভ্রাম্যমান কাজ করে- এমন অনেক দালাল রয়েছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ অফিস অনেকটা দালালদের কব্জায় চলে গেছে। দালাল ছাড়া কোন কাজই হয়না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •