cbn  

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, বান্দরবানঃ

বান্দরবানে থানচি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সৃষ্টি করা ম্রো জনগোষ্ঠীর দুইটি পাড়ার সংরক্ষিত প্রাকৃতিক বন ধংস করে ভূমি দখল করার অভিযোগ উঠেছে। বন ধংসের চিহ্ন মুছে দিতে দখল করা ভূমিতে তড়িঘড়ি করে ফলজ চারা রোপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অবৈধভাবে দখল করা খাস ভূমিতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) দুটি প্রকল্পও রয়েছে।

বিএডিসি প্রকৌশল অফিস সুত্র জানায়, সৌরশক্তি চালিত পাম্পের সাহায্যে ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে ফল ও সবজি বাগানে সেচ সম্প্রসারণ কর্মসূচির আওতায় প্রথম পর্যায়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে থানচি ইউনিয়নে ছাইক্লাংপাড়ায় একটি সৌরশক্তি চালিত ড্রিপ সেচ সিস্টেম (সৌরশক্তি দিয়ে মোটরের মাধ্যমে নির্ধারিত ট্যাংকে পানি সংরক্ষণ করা হয়। ট্যাংক থেকে পাইপের মাধ্যমে প্রতি গাছের গোড়ায় ফোটা ফোটা পানি সরবরাহকরণ পদ্ধতি) স্থাপন করা হয়। একই কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে চলতি অর্থবছরে একটি বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, থানচি ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডে থানচি-আলীকদম সড়কের ৮ কিলোমিটার এলাকায় রুমবেত ও অম্পুং পাড়াবাসীর শতবর্ষাধিক সংরক্ষিত বিশাল সামাজিক বন ছিল। বনে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ, নানান প্রজাতির বৃক্ষ ছিল। ছয় বছর আগে এ বনের একাংশ ও গত বছরে শেষ অংশ ধংস করে সম্পূর্ণ ভূমি অবৈধভাবে দখল করে থোয়াইহ্লামং মারমা। প্রতিবারেই বন ধংসের পরপরই তড়িঘড়ি করে ফলজ চারা রোপন করেছে বলে জানান স্থানীয়রা। জানা গেছে, তিনি বর্তমানে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও থানচি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আ’লীগের প্রার্থী। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয়লাভ করেননি বলে জানান স্থানীয়রা।

সরেজমিনে দেখা য়ায়, থানচি-আলীকদম সড়কের ৮ কিলোমিটার এলাকায় সড়কের পূর্ব পাশে রুমবেতপাড়া ও পশ্চিম পাশে দুই স্তরে করা বিশাল আম বাগান। প্রথম স্তরের বাগানে আনুমানিক পাঁচ বছর বয়সের ও পরের স্তরে গত বছরের করা আম বাগান। দেখা যায়, প্রথম স্তরের বাগানে বিএডিসি’র সৌর শক্তি চালিত ড্রিপ সেচ সিস্টেম ও অন্য স্তরের বাগানে পাহাড় কেটে নতুন তৈরি করা একটি বাঁধ রয়েছে। বাঁধে পানি মজুদ হওয়ার মতো প্রাকৃতিক কোনো পানির উৎস নাই। তবে পানি মজুদ করতে বাঁধ হতে অনেক নিচের মগক খাল হতে বাগানের প্রথম স্তরে স্থাপিত সৌরশক্তি দিয়ে মোটরের মাধ্যমে পাইপে করে বাঁধে পানি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, বিএডিসির প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম রয়েছে। না হলে প্রকৃত চাষীকে না দিয়ে একই ব্যক্তিকে দুটি প্রকল্প দেয়া হলো কেন বলে জানতে চান তারা।

১৯ পরিবারের রুমবেত ও ৩০ পরিবারের অম্পুং পাড়াবাসী জানায়, ম্রো জনগোষ্ঠীতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ও ধর্মীয়, সামাজিকসহ যে কোনো রীতি-নীতি প্রতিপালন করতে বাঁশ একটি অপরিহার্য উপাদান। বাঁশ না থাকলে ম্রো সমাজে কোনোকিছুই পরিপূর্ণ হয়না। তাই আমাদের পূর্ব পুরুষদের সৃষ্টি করা শতবর্ষাধিক সামাজিক সংরক্ষিত বন রক্ষা করে আসছিলাম। বনে তিন প্রজাতির বাঁশ ও বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ ছিল। কিন্তু ছয় বছর আগে আমাদের ঐতিহ্যবাহী অতিগুরুত্বপূর্ণ বন ধংস করতে শুরু করে থোয়াইহ্লামং। আমরা বাধা দিয়ে বনের এক-তৃতীয়াংশ রক্ষা করেছিলাম। জেলা পরিষদে সদস্য মনোনীত হওয়ার পরে গতবছরে বনের বাকী অংশ ধংস করে। বাধা দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। আমাদের সামাজিক বনের প্রায় ১৫ একর ভূমি দখল করে আম বাগান করেছে। এখন কোথাও এরকম সামাজিক বন করার জায়গা নেই। এছাড়া তায়তং ম্রো নামের এক ব্যক্তির কাজু বাদাম, রূপালী জাতের আম ও চম্পা ফুলের দুই একরের মিশ্র বাগানও দখল করতে চাচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এদিকে বিএডিসি প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজে অনিয়ম পাওয়া গেছে। প্রকল্পে সৌরশক্তি চালিত ড্রিপ সেচ সিস্টেম প্রযুক্তি ছাইক্লাংপাড়ায় স্থাপন দেখানো হলেও তা দেয়া হয়েছে রুমবেত পাড়া এলাকায়। তাছাড়া এ প্রযুক্তিতে উপকারভোগী দেখানো হয়েছে ২০ পরিবার। সরেজমিনকালে দেখা গেছে কেবল একটি বাগান প্রযুক্তিটির সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে এ প্রযুক্তির অপব্যহার করে মগক খাল হতে পাইপের মাধ্যমে বিএডিসি’র অন্য একটি বাঁধে পানি ভরানো হচ্ছে।

এসব বিষয়ে থোয়াইহ্লামং সাংবাদিকদের জানান, পাড়া বনের বিষয়ে জানা নেই। ওখানে আমার নামে কোনো জায়গা নেই। ওই জায়াগাতে আম বাগান হচ্ছে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটছে। জানতে চান, এসব বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করার কি আছে। আমি এখন নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত আছি। প্রযুক্তি ও বাঁধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানবে। আমি জানি না।

ভূমির বিষয়ে থানচি মৌজার হেডম্যান হ্লাফসু জানান, রুমবেত ও অম্পুং পাড়া বন ধংস করার বিষয় জানতে পেরে থোয়াইহ্লামংকে তা না করতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তিনি শুনলেন না। তাছাড়া জায়গাটি খাস। খাস জায়গার মালিকানা সরকারের।

এ প্রসঙ্গে বিএডিসির বান্দরবান প্রকৌশল বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল নায়েম জানান, থানচিতে জেলা পরিষদ সদস্য থোয়াইহ্লামং-এর নামে প্রকল্প দেওয়া হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •