cbn  

আহমদ গিয়াসঃ
বাংলাদেশের সমুদ্র সীমা দেশের মূল ভূ-খন্ডের প্রায় সমান। অথচ দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের মাত্র ১৫.৪২% ভাগ অবদান সামুদ্রিক মাছের। বঙ্গোপসাগরের এ বিশাল জলরাশি থেকে এ উৎপাদন খুবই অপ্রতুল। সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা কৌশল জানা না থাকায় আমরা কাঙ্খিত উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছি বলে মনে করছেন সামুদ্রিক মৎস্য বিজ্ঞানীরা। তবে সেই ব্যবস্থাপনা কৌশল রপ্ত করার জন্য গত ৩ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা নিবীড় গবেষণা চালাচ্ছেন । ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে বঙ্গোপসাগরে ৪৩০ প্রজাতির মাছ সনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় সাড়ে ৩শ মাছের ক্যাটালগিং করা হয়েছে। বাকীগুলোর ক্যাটালগিং এর পাশাপাশি আরো নতুন প্রজাতির মাছের সন্ধানে বঙ্গোপসাগরে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এবিষয়ে আগামী ২/৩ মাসের মধ্যে একটি বই প্রকাশ করা হবে।
বিএফআরআই উদ্ভাবিত চারটি মেরি কালচার প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের কাছে হস্তান্তর বিষয়ে বুধবার কক্সবাজারে আয়োজিত এক কর্মশালায় মৎস্য বিজ্ঞানীরা এ তথ্য তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিএফআরআই) কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জুলফিকার আলীর সভাপতিত্বে কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উক্ত প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক (প্রযুক্তি হস্তান্তর ও মনিটরিং ইউনিট) ড. ফৌজিয়া ইয়াসমিন।
কর্মশালায় বলা হয়, আমাদের সমুদ্রের আয়তন ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার হলেও মৎস্য উৎপাদনে সামুদ্রিক মাছের অবদান খুবই অপ্রতুল। এ কারণে বর্তমান সরকার সামুদ্রিক মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে বøু-ইকোনমি জোরদারের যে পরিকল্পনা নিয়েছে তারই লক্ষ্যে এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি বিষয়ে জোর গবেষণা চলছে। আর গবেষণার মাধ্যমে অর্জিত এসব সফল প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসাবে বুধবার দেশের উপকূলীয় ৬ জেলার ৩০ জন মৎস্য কর্মকর্তাকে কক্সবাজারে দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
কর্মশালায় বিএফআরআই উদ্ভাবিত চারটি মেরি কালচার প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ের বিজ্ঞানীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রযুক্তিসমূহ হল- মেকানিক্যাল ফিশ ড্রায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসম্মত ও গুণগত মানের শুটকি তৈরি কৌশল, কাঁকড়া প্রজনন ও চাষ ব্যবস্থাপনা, উপকূলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ ও ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং সামুদ্রিক মাছের পোনা উৎপাদনে লাইভ ফিড চাষ ইত্যাদি।
কর্মশালায় বিএফআরআই উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন বিএফআরআই, কক্সবাজারের উপ-পরিচালক ড. আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. যাকীয়াহ রহমান মনি, কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম ও জাকিয়া হাসান প্রমুখ।
আলোচকরা আরো আরো উল্লেখ করেন যে, উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য হস্তান্তর করা হলেও এসব প্রযুক্তির আরো উন্নয়ন ঘটানোর জন্য গবেষণা চলমান থাকবে।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, হ্যাচারিতে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনে আমরা সফল হলেও আমাদের অর্জিত প্রযুক্তি এখনও অনেক দূর্বল। কাঁকড়া পোনা শতকরা মাত্র এক থেকে দেড় ভাগ বাঁচে। আমাদের লক্ষ্য এ হার শতকরা দশভাগে উন্নীত করা। তবে সী-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল চাষে আমাদেরকে উন্নত বিশ্বের কাতারে ওঠতে বেশিদিন সময় লাগবে না বলে আশা করেন তিনি।
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক ড. ফৌজিয়া ইয়াসমিন বলেন, বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উন্নীত করার জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে বøু-ইকোনমি তথা সমুদ্র সম্পদের উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্র সীমা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়ার পর আমাদের সমুদ্রসম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহুমুখী গবেষণা শুরু হয়েছে। উন্নত বিশ্বের কাতারে যেতে হলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জুলফিকার আলী বলেন, সর্বশেষ ১৯৬৯ সালে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা বঙ্গোপসাগরে জরীপ চালিয়ে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ সনাক্ত করেছিল। তবে এরপর জরীপ না হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে মৎস্য সম্পদের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া ছিল কঠিন। কিন্তু সামুদ্রিক অনুসন্ধানী জাহাজ মীন সন্ধানীর মাধ্যমে সেই হালনাগাদ জরীপ চলছে। জরীপে অনেকগুলো নতুন প্রজাতির মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। আবার কিছু মাছ বিলুপ্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যেসব মাছ বিপন্ন তালিকায় রয়েছে, সেগুলো হ্যাচারিতে এনে কৃত্রিম উপায়ে বংশ বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •