ইমাম খাইর, সিবিএনঃ
দেশের অন্যতম লবণ শিল্প এলাকা কক্সবাজার সদরের ইসলামপুর থেকে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক প্রায় ৫০০ বস্তা সোডিয়াম সালফেটসহ একটি কাভার্ডভ্যান জব্দ করে পুলিশে দিয়েছে জনতা।
এসময় রুম্মান ট্রেডার্স ও মেসার্স নিউ পায়রা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামের কয়েকটি চালান ফরম জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত বস্তাগুলোর গায়ে ‘গ্লোবার সল্ট’ ও ‘মেড ইন চায়না’ লেখা আছে।
৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইসলামপুর লবণ শিল্প এলাকা থেকে কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করা হয়। পরে ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের হেফাজতে ওই কাভার্ড ভ্যানটি নিয়ে যাওয়া হয়।
ইতোপূর্বে ইসলামপুরে সোডিয়াম সালফেট কেউ আমদানি করেনি। এই প্রথম শরীরের জন্য ক্ষতিকারক এই রাসায়নিক আমদানি করে লবণশিল্প ধ্বংসকারী চক্র। মূলতঃ দেশীয় লবণের সাথে মিশিয়ে অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যেই কম দামের, অথচ দেখছে লবণের মতো সোডিয়াম সালফেট আমদানি করা হয়।

সোডিয়াম সালফেটের আমদানির ওপর কোন বিধিনিষেধ না থাকায় এই লবণ আমদানিতে কোন ধরনের আইনগত সমস্যা থাকে না। শুল্কের হার কম থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষাক্ত লবণের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। এই মুহূর্তে এই ক্ষতিকারক লবণের ওপর আমদানির নিয়ন্ত্রণ আইনগতভাবে জোরালো করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, গ্লোবার সল্টের নামে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ‘সোডিয়াম সালফেট’ আমদানি করছে একটি চিহ্নিত সিন্ডিকেট।

ইসলামপুরের বেশ কয়েকজন লবণ মিল মালিক জানিয়েছে, ডিজিটাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিক মোকতার আহমদ গ্লোবার সল্ট এর নাম দিয়ে সোডিয়াম সালফেট আমদানি  করেছে। তার কারণে ইসলামপুরের প্রকৃত লবণ ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষুব্ধ। যেকোনো মূল্যে লবণ শিল্প বিরোধী এই অপতৎপরতা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা।

ইসলামপুর লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ শামসুল আলম আজাদ বলেন, লবণ উৎপাদনের এই মৌসুমে সোডিয়াম সালফেট আমদানি করা লবণ শিল্পের জন্য একটি অশনি সংকেত। এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা না গেলে লবণ চাষী ও ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখনতো দেখছি সোডিয়াম সালফেট মাঠে চলে আসছে।

তিনি দুঃখের সাথে বলেন, এই শিল্প এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এরই মাঝে ক্ষতিকারক সোডিয়াম সালফেট কেন আমদানি করার প্রয়োজন হচ্ছে? এই সমস্ত সাধু শয়তান কারা? কর্তৃপক্ষকে বের করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম (দাদা) মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক সোডিয়াম সালফেট আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, মজুদ থাকা সত্ত্বেও লবণ আমদানি এবং সোডিয়াম সালফেট -এই দুই কারণে স্থানীয় লবণশিল্প ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। লবণের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত ও দেশের লবণ শিল্প বাঁচাতে ষড়যন্ত্রকারীদের রুখতে হবে।

সূত্র মতে, ভোজ্য লবণ ‘সোডিয়াম ক্লোরাইডে’ সর্বোচ্চ পিএইচ থাকে ৭।
আর ‘সোডিয়াম সালফেটের’ পিএইচ ৯ এর উপরে থাকে।
যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছে।
দেশীয় লবণশিল্প বিরোধী চক্রকে এখনই ঠেকাতে হবে বলে জানিয়েছে ভোক্তারা।

২০১৫ সাল থেকে আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে সোডিয়াম ক্লোরাইড। আমদানি অব্যাহত রয়েছে সোডিয়াম সালফেট। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সোডিয়াম সালফেটের আড়ালে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করছে। অধিক মুনাফার আশায় এসব রাসায়নিক একসঙ্গে মিশিয়ে আনার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, দেশীয় লবণ শিল্পকে বাঁচাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, বিসিকসহ সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ চেয়েছে লবণচাষিরা।
কক্সবাজার উপকূলের বেশিরভাগ মানুষ এই লবণ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে দীর্ঘকাল থেকে।
একটি চক্র আছে, যাঁরা নিজ দেশের লবণের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করতে চায়। এতে দেশিয় শিল্প ধ্বংস হবে এবং আমদানিতে নয়ছয় করে সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বিসিকের কিছু অসাধু কর্তারাও এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বিসিকের তথ্য মতে, বাংলাদেশে ১৪ লাখ মেট্রিক টন সোডিয়াম সালফেট (যা দেখতে লবণ, তবে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর) আমদানি করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যামিকেল কোম্পানি ডিটারজেন্ট ও সাবান তৈরি করতে ভারত ও চীন থেকে সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে। এই সোডিয়াম সালফেট দিয়ে খাবার লবণ তৈরি করছে বিভিন্ন লবণ কোম্পানি। এ কারনে ৫০০ টাকার লবণ হয়ে গেছে ১৫০ টাকা।

খাবারের লবণ আর পণ্য প্রস্তুতকরণের লবণ এক নয়। রান্নায় যে লবণ ব্যবহার হয় তা মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড। আর শিল্পদ্রব্য প্রক্রিয়াজাতে যে লবণ প্রয়োজন হয় তা সোডিয়াম সালফেট, যা মানবদেহের জন্য শুধু ক্ষতিকরই নয়, প্রাণঘাতীও বটে।

অভিযোগ উঠেছে, বিষাক্ত সোডিয়াম সালফেট এখন খাবার লবণ হিসেবে বাজারে নৈমিত্তিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। খাবার লবণ সোডিয়াম ক্লোরাইড দেশীয় উৎপাদন পদ্ধতিতে তৈরি করে ক্রেতাদের কাছে নিয়ে আসা হয়। ফলে এই লবণ বাইরে থেকে আমদানির সুযোগ কম থাকে। কিন্তু খাবার লবণের চাহিদার সঙ্গে লবণ উৎপাদিত জমির সংখ্যা অপ্রতুল থাকায় ঘাটতি পড়ে যায় প্রচুর। সঙ্কট দেখা দিলে আমদানির ব্যাপারে ছাড় দেয়া হয়। সোডিয়াম সালফেট বিদেশ থেকে আনার ব্যাপারে তেমন কোন আইনগত প্রতিবন্ধকতা না থাকায় আমদানি হয়েছে অত্যধিক। কাঁচামাল সঙ্কটে শিল্প-কারখানায় সোডিয়াম সালফেটের ব্যবহার কমে যাওয়ায় তা খাবার লবণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বাজারজাতও করা হচ্ছে। ক্লোরাইডের তুলনায় সালফেটের আমদানি শুল্ক তুলনামূলক কম।

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •