– সাইফুল্লাহ মানছুর

পাকিস্তান কর্তৃক ভারতীয় কমান্ডার অভিনন্দন বর্ধমানকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাকে খুব বেশি মহিমান্বিত করার প্রয়োজন নেই। তবে এটুকু অবশ্যই বলা যায়, ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখন পর্যন্ত যথেষ্ট সেনসিবল (যৌক্তিক) থেকেছেন। ইমরান খানের হাতে যুদ্ধ এড়ানো ছাড়া অন্য কোন অপশন ছিল না। ভাগ্য ভাল, যুদ্ধ এড়ানোর মোক্ষম সুযোগও সে পেয়ে গেছে অভিনন্দন বর্ধমানের রূপে। এই সুযোগ সে হাতছাড়া করবেই বা কেন? এতে করে, যুদ্ধ এড়ানোর ফলে মূলত ভারত-পাকিস্তান দুই দেশই লাভবান হয়েছে। ইমরান খান চাইলে অভিনন্দনের বিনিময়ে ভারতীয় কারাগারে অন্তরীণ থাকা পাকিস্তানিদের মুক্ত করার ব্যবস্থা করতে পারত। বর্তমানে, ভারতের কারাগারে পাকিস্তানের প্রায় ৩৪৭ জন এই মূহুর্তে বন্দী আছে। কিন্তু, ইমরান খান এই রিস্কটুকুও নেননি। কারণ, যেকোন মূল্যে যুদ্ধ এড়ানোটাই পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দুই দেশের কোনটিই এখনই যুদ্ধে জড়ানোর মত অবস্থায় নেই। তাই, অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দিয়ে পাকিস্তান সাপও মারতে পারল, লাঠিও ভাঙতে হল না। তাই, ইমরানের এই পদক্ষেপকে খুব বেশি মহিমান্বিত করার যেমন কিছু নেই, তেমনি দরকার নেই পুরনো কোন ইতিহাস টেনে এনে এটাকে গুরুত্বহীন করারও। ব্যাপারটি বোঝার জন্য একটা তত্ত্ব আপনাদের সামনে ব্যাখ্যা করছি।

গেইম থিউরি বা ক্রীড়া তত্ত্বের নাম অনেকেই শোনে থাকবেন। এই গেইম থিউরিরই একটি মডেল হচ্ছে- চিকেন মডেল। চিকেন মডেলের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন যে, যুদ্ধমান দুইটি রাষ্ট্রকে এখানে একই রাস্তা বরাবর, সংঘর্ষের উদ্দেশ্যে মুখোমুখি ছুটে আসা দুইটি গাড়ির সাথে তুলনা করা হয়। অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী রাষ্ট্রটি এক্ষেত্রে তার যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখাতেই বেশি সচেষ্ট থাকবে। তার গাড়িটির এক্ষেত্রে হুইল, ব্রেক নষ্ট হবে। ড্রাইভারের চোখে থাকবে অন্ধদের চশমা। মানে সে বোঝাতে চাইবে, সংঘর্ষে পতিত হওয়া ছাড়া তার আর কোন উপায় নেই। এই অবস্থায় অন্য গাড়িটির জন্য দুইটি অপশন থাকে। হয় সংঘর্ষে জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অথবা, নিয়ন্ত্রণহীন সে যুদ্ধংদেহী গাড়ির সামনে থেকে সরে গিয়ে সংঘর্ষ এড়িয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে একটা বিষয় উল্লেখ করা উচিত। শক্তিশালী রাষ্ট্রটি যদিও নানা হম্বিতম্বির মাধ্যমে তার যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করে, তথাপি তারাও যুদ্ধ সংগঠিত হোক এমনটি চায় না। সে ভাবে, তার যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখে প্রতিপক্ষ যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে। এতে প্রতিপক্ষ কার্যত হেরে গেলেও অসন্তুষ্ট থাকবে না। আর শক্তিশালী রাষ্ট্রটিও লাঠি না ভেঙেই সাপটি মেরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবে। ব্যাপারটিকে অনেকটা- “ওরে বুবু, সরে দাঁড়া/ আসছে আমার পাগলা ঘোড়া” এর সাথে তুলনা করা যায়। শক্তিশালী রাষ্ট্রের হুমকি প্রদানকে আমরা তুলনা করতে পারি, “পাগলা ঘোড়া খেপেছে, চাবুক ছুড়ে মেরেছে” এর সাথে। এক্ষেত্রে, যে রাষ্ট্রটি যুদ্ধ বা সংঘর্ষ এড়াল, তাকে আমরা বলতে পারি চিকেন। আর ক্রীড়া তত্ত্বের এই চিকেন মডেলে কার্যত দুই দেশই Win-Win সিচুয়েশনে থাকে।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহতেও এই একই ঘটনায় ঘটেছে। এতে অর্থনৈতিকভাবে উভয় দেশই Win-Win সিচুয়েশনে থাকলেও, রাজনৈতিকভাবে ভারত একটু ব্যাকফুটে গিয়েছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর নরেন্দ্র মোদী আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।পরিশেষে বলতে পারি, একটি স্থিতিশীল পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা এবং শক্তির ভারসাম্যের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান সে পথেই হাঁটুক এমনটিই প্রত্যাশা।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •