এম, রিদুয়ানুল হক, কক্সবাজারঃ
কক্সবাজারের কাঁকড়া বিশ্বে ২০ দেশে রপ্তানী করে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা হলেও উপকূলীয় বনবিভাগের বাধার কারণে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে কাঁকড়া সরবরাহে। নানা অজুহাতে বনবিভাগের লোকজন বাধা সৃষ্টি করায় কাঁকড়ার সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে জানালেন ব্যবসায়িরা। কক্সবাজারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখা হিমায়িত খাদ্য (কাঁকড়া) সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতিদিন অন্তত ১২ টন কাঁকড়া ঢাকায় রপ্তানীকারকদের কাছে সরবরাহ করা হলেও এখন তা ৬ টনে নেমে এসেছে। দুই বনবিভাগের লোকজন টাকার জন্য বিভিন্ন ভাবে বাধার সৃষ্টি করায় এমনটি হচ্ছে বলে জানালেন কয়েকজন ব্যবসায়ি। মহেশখালী কাঁকড়া উৎপাদন ও সরবরাহকারী সমবায় সমিতি’র সভাপতি জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, এই সমিতির মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত ২০০ কোটি টাকার কাঁকড়া সরবরাহ হয়ে থাকে। যথা সময়ে ঢাকায় পৌছানো না গেলে মোটা অংকের টাকা লোকসান যায় ব্যবসায়িদের। প্রতিদিন গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার আগে হাজির হয় উপকূলীয় বনবিভাগের লোকজন, তাদের টাকা দিয়ে বিদায় করলে হাজির হয় বনবিভাগের লোকজন। তাদের দফায় দফায় বাধার কারণে কয়েকবার গাড়ি সময়মত ঢাকায় পৌছতে না পেরে মোট অংকের টাকা লোকসান গেছে ব্যবসায়িদের। কাঁকড়া ব্যবসায়ি সমিতির জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক দিলীপ কুমার শীল জানিয়েছেন, টেকনাফ থেকে একটি কাঁকড়াবাহী গাড়ি ঢাকায় পৌছতে অন্তত ১৫ স্থানে টাকা দিতে হয়। তৎমধ্যে ১২টি স্থানে বনবিভাগকে টাকা দিতে হয়। এতে সময়মত ঢাকায় পৌছানো যায়না। বিলম্ব হওয়ার কারণে অনেক কাঁকড়া মাঝপথে মারা যায়। ফলে লোকসান গুনতে হয় ব্যবাসয়িদের। ব্যবসায়ি চকরিয়ার কামাল হোসেন জানিয়েছেন, সরবরাহকৃত কাঁকড়া রপ্তানীযোগ্য। এটি সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে পড়ে না। ছোট কাঁকড়া না ধরার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যে কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানী হয় এগুলি বড় কাঁকড়া। এই ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে অন্তত জেলার ৫০ হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। অপরদিকে উপকূলীয় বনবিভাগের রেইঞ্জার মুহিবুল হক জানিয়েছেন, বাধার সৃষ্টি করার বিষয়টি সত্য নয়। ব্যবসায়িদের শুধুমাত্র লাইসেন্স এর বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কক্সবাজার সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মঈন উদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজারের কাঁকড়া চাষীরা নিয়মিত প্রায় ২০টি দেশে কাঁকড়া রপ্তানী করছে। দেখাদেখিতে অনেকেই এখন বাণিজ্যিক কাঁকড়া চাষে উদ্যোগি হয়েছেন। আগামিতে কাঁকড়া উৎপাদন কক্সবাজারে আরো বাড়বে বলে জানান তিনি। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় বিশ্বে অন্তত ২০টি দেশে কক্সবাজারের কাঁকড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তৎমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে কক্সবাজারের কাঁকড়ার সুখ্যাতি রয়েছে। ওই সব দেশের চাহিদামত কাঁকড়া খুলনা বিভাগ ও কক্সবাজার জেলা থেকে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়াও ১৯৯৭ সালে দেশের পরিবেশ রক্ষায় কাঁকড়া রপ্তানী নিষিদ্ধ করে সরকার। তখন বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে পুনরায় কাঁকড়া রপ্তানী শুরু হয়। কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ডঃ মোঃ আবদুল আলীম জানায়, বাংলাদেশের উপকুলীয় এলাকায় পাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়ার মধ্যে (মাড ক্রাব) শীলা কাঁকড়ার দাম ও চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে সবচেয়ে বেশী। তাই কাঁকড়া চাষ ও ফ্যাটেনিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চিংড়ি চাষে ভাইরাসজনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি থাকলেও কাঁকড়া চাষে এ ঝুঁকি নেই। তিনি আরো জানান, সরকার কক্সবাজার ও খুলনা অঞ্চলে কাঁকড়া চাষ সম্প্রসারণের জন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করেছে। কাঁকড়া পোনা উৎপাদন ও চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ হলে উৎপাদিত কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের এই অন্যতম রপ্তানি পণ্য কাঁকড়ার প্রধান উৎপাদন এলাকা হবে কক্সবাজার জেলা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •