শাহেদ মিজান, সিবিএন:

বাঁকখালী নদী খননের নামে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। চক্রটি চলমান বাঁকখালী নদী খননের দায়িত্বে রয়েছে। নদী খননের আড়ালে চক্রটির নজর এখন বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা। কিন্তু এভাবে অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া বালু উত্তোলনের শিকার হচ্ছে স্থানীয়রা। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন বিস্তীর্ণ জমি। এতে নি:স্ব হওয়ার পথে খরুলিয়ার কয়েক শত মানুষ। ভুক্তভোগীরা ইতিমধ্যে মধ্যে প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পায়নি বলে জানিয়েছেন তারা।

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নৌ-মন্ত্রাণলয়ের অর্থায়নে বাঁকখালী নদী খনন করছে ‘ওয়েস্টার্ন’ ইঞ্জিনিয়ারিং’ কোম্পানি। কোম্পানিটি বিগত তিনমাস ধরে বাঁকখালী নদীর কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া পয়েন্টে খনন কাজ চালাচ্ছে। কিন্তু খননকালে নদীর মূল গতিপথ খননের আড়ালে পাশের ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলী জমির থেকে বালু উত্তোলন করে নিচ্ছে। মূলত খননের আড়ালে ‘বালু বাণিজ্যে’ জড়িয়ে পড়েছে খনন কাজে জড়িতরা। তারা নদী খননের দোহাই দিয়ে বিগত একমাস ধরে বাঁকখালী নদীর খরুলিয়া পয়েন্টে অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়াভাবে ফসলী জমি গিলে খাচ্ছে। খননের গ্রাসে পড়ে ইতিমধ্যে অন্তত ১০ একর ফসলী জমি বিলীন হয়ে গেছে। এভাবে অবৈধ খনন অব্যাহত থাকায় আরো ৩০ একর জমির বিলীন হওয়ার হুমকির মুখে রয়েছে। একই সাথে ওইসব জমিতে থাকা চারটি বসতবাড়ি, একটি নুরানী মাদ্রাসা ও একটি মসজিদও হুমকির বিলীনের হুমকিতে রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, বাঁকখালী নদীর খনন কাজে নিয়োজিত ‘ওয়েস্টার্ন’ ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের কোম্পানিটি শুরু থেকেই নদী খননের আড়ালের অবৈধ বালু বাণিজ্য করে আসছে। তারা নিয়ম না মেনে নদী খনন থেকে উত্তোলন করা বালু ও মাটি দেদাঁরসে বিক্রি করে আসছে। রেললাইনসহ স্থানীয় বিভিন্ন জায়গা ভরাট এবং পাকা স্থাপনা নির্মাণ কাজে বিক্রি করছে এভাবে তারা কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ খননের শর্ত মতে, খনন থেকে উত্তোলিত মাটি দিয়ে নদীর দু’পাড়ে বাঁধ দিতে হবে।

ভুক্তভোগীদের আরো অভিযোগ, গত তিনমাস ধরে বাঁকখালী নদীর খুরুলিয়া পয়েন্টে খননের কাজ শুরু হয়। শুরু থেকেই নদীর গতিরপথের বাইরের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে শত শত টন বালু খনন করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। বালুগুলোর অধিকাংশই রেললাইন কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া আরো বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ বালু বিক্রি করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যে ১০ একর ধান, ভুট্টা, সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের উপযোগী জমি বিলীন হয়ে গেছে। এতে সেখানে থাকা চারটি বসতবাড়ি, একটি মসজিদ ও একটি নূরানী ধরে পড়ার মুখে রয়েছে। বর্ষাকালেই এসব স্থাপনাগুলো পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলী জমির বালু উত্তোলনের বাধা দিয়েছিলেন ভুক্তভোগীরা। এর ফলে কয়েকদিন খনন বন্ধ ছিলো। সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলও এভাবে বালু উত্তোলন না করতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু অদৃশ্যের শক্তির প্রভাবে ভুক্তভোগীদের বাধা ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারো বালু তুলে নিয়ে যাচ্ছে চক্রটি।

ক্ষতিগ্রস্ত জসিম উদ্দীন, মাস্টার হাবিব আহাম্মদ, মাস্টার রশিদ আহাম্মদ, দলিল আহাম্মদ, ফরিদুল আলম, অজি উল্লাহ বলেন, যে জমি থেকে বালু তুলে অবৈধভাবে বিক্রি করা হচ্ছে সে জমিগুলো ওয়ারিশসূত্রে আমরা মালিক। এই সংক্রান্ত আপডেট কাগজপত্র রয়েছে আমাদের। একই সাথে আমরা ভোগ দখলেও রয়েছি। কিন্তু চক্রটি প্রভাব কাটিয়ে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমাদের জমি থেকে বালু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এতে আমাদের জমিগুলো নদীর সাথে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এভাবে অবৈধভাবে বালু লুট অব্যাহত থাকলে খরুলিয়ার সব জমি বিলীন হয়ে যাবে।

তারা জানান, চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ উর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা বেলাল আহমদ (বর্তমানে বদলী) ও ইঞ্জিনিয়ার শাহাজাহান নামের দু’জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও কোনো দপ্তর এর সুরাহা করতে এগিয়ে আসেনি। এই সংক্রান্ত জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগটি তদন্ত করার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) দায়িত্ব দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু বিষয়টি এখন পর্যন্ত কোনো দূর এগোয়নি।

অভিযোগ মতে, ‘ওয়েস্টার্ন’ ইঞ্জিনিয়ারিং’ মাধ্যমে খনন কাজে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শাহাজাহান নামের ব্যক্তিসহ একটি চক্র ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলীর জমির বালু লুট করছে। এই চক্রে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী লোকও জড়িত রয়েছে। মূলত চক্রের সাথে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীদের জোরেই ফসলী জমি থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চক্রের স্থানীয় লোকগুলোর ভয়ে ভুক্তভোগীরা এখন মুখ খোলারও সাহস পাচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারি কাজে বাধা দানের দোহাই তুলে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়ারও হুমকি দিচ্ছে চক্রটি। এতে চরম অসহায় পড়েছে ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে নৌবাহিনীর দায়িত্বরত কর্মকর্তা বেলাল আহমদ জানান, এরকম কোনো বিষয় তার জানা নেই। কক্সবাজার থেকে বদলী হয়ে বর্তমানে অন্যত্র রয়েছেন।

কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, ‘খনন থেকে যে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে এটা দিয়ে বাঁধ হওয়ার কথা। এভাবে যদি মাটিগুলো বিক্রি করে দেয়া হয় তাহলে বাঁধ টেকসই হবে না। এতে বর্ষায় বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলী জমি থেকেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। তাই আমি সংশ্লিষ্টদের এভাবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে খনন না করার নির্দেশ দিয়েছি।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •