# নতুন ৫০০ জনের তালিকা পুলিশের হাতে

# মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত ৬১ জন

ইমাম খাইর, সিবিএনঃ 
আত্মসমর্পণের পরেও থামছেনা ইয়াবা ব্যবসা। প্রায়প্রতিদিন ঘুম ভাঙলেই শোনা যায় কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা। মরছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। মাঠে তৎপর রয়েছে পুলিশসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। তবু ঘুম ভাঙছেনা মাদক ব্যবসায়ীদের। এমনকি ইয়াবাবাজদের আত্মসমর্পণের দিনেও ইয়াবার চালান ধরা পড়ে র‌্যাবের হাতে। প্রতিদিন কোন না কোন এলাকায় ইয়াবা উদ্ধারের খবর আসছে গণমাধ্যমে। মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে কক্সবাজার জেলায় এই পর্যন্ত ৬১ জনের মতো নিহত হয়েছে। তারপরও কেন বন্ধ হচ্ছেনা ইয়াবা নামক ‘ছোট্ট একটি ট্যাবলেট’ নেশা আর পেশা?-প্রশ্ন সবার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের ইয়াবার ভোক্তা বেড়েছে। এক পয়েন্ট বন্ধ হলে অন্য পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান যাচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান থমকে গেছে। ‘ইয়াবা ডন’রা রয়ে গেছে প্রকাশ্য বিচরণে। তাছাড়া চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশব্যাপী ইয়াবার বাজার সৃষ্টি হয়েছে। তাই ইয়াবা ব্যবসা সহজেই বন্ধ হচ্ছেনা। পুলিশ বলছে, ইয়াবা ব্যবসা ‘শতভাগ নির্মূল’ সম্ভব নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে, ইয়াবার প্রধান উৎস মিয়ানমার। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুই পারের পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো বহাল তবিয়তে আছে। ভারতের কিছু অংশ ও থাইল্যান্ড থেকে ইয়াবা আসছে। এই প্রতিবেশী দেশ থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে ইয়াবা। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) বেশিরভাগ সদস্য সরাসরি জড়িত ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে। বিজিবির কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। যেটি খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন। তাদের সহযোগিতা করে আসছে দুই দেশের পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো। তাছাড়া ‘ইয়াবা ব্যবসায়ী’ তালিকার শীর্ষে থাকা অনেকে এখনো অধরা।
সমুদ্রপথে ইয়াবা টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া, সাবরাং, উখিয়া উপজেলার মনখালী, মহেশখালীর সোনাদিয়া, ঘটিভাঙ্গাসহ পেকুয়া উপজেলার মগনামা ও উজানটিয়া, কুতুবদিয়া ও আনোয়ারা উপজেলার সমুদ্রপথে খালাস করা হয়। বিশেষ করে টেকনাফ উপকূল দিয়ে সবচেয়ে বেশি ঢুকছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক।
বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরও ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না কেন? জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন)কে বলেন, দেশে লাখ লাখ ভোক্তা আছে। ইয়াবা খাইতেছে। তাদের কি আমরা আটকাতে পারছি? মাঝখানে কোন মেকানিজম কি আমাদের আছে? নাই। আমরা টেকনাফের রোড বন্ধ করব, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা অন্য রোড ব্যবহার করছে। কারণ, দেশের ভেতরে বিরাট একটা বাজার আছে। চাহিদা তৈরী হয়েছে।
তিনি বলেন, চিহ্নিত গডফাদারদের বাইরেও মাদক ব্যবসায়ী আছে। আত্মসর্পণকারীদের কাছ থেকে আরো ৫শতাধিক লোকের নাম পেয়েছি। তাদের অনেকে কমবেশী পুরনো মাদক ব্যবসায়ী। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।
দেশের ভেতরে লাখ লাখ খাদক। এত বড় বাজার রেখে কারো একার পক্ষে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন পুলিশ সুপার।
তিনি বলেন, আমরা কঠোর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে ৭০% এর চেয়ে মাদক ব্যবসা এই রোড দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
মাদকবিরোধী অভিযান ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৬১ জন নিহত:
২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর শুধু টেকনাফে ৫১জনসহ কক্সবাজার জেলায় এই পর্যন্ত ৬১ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত (দুই মাসে) কক্সবাজার জেলায় বন্দুকযুদ্ধে মোট ২৫ জন নিহত হয়েছে। সেখানে শুধু টেকনাফের রয়েছে ২২ জন।
তথ্য মতে, ১ মার্চ ভোরে টেকনাফ উপজেলায় পুলিশ ও বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) সদস্যদের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে চার জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং এলাকায় পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার চৌধুরী পাড়ার আব্দুল জলিলের ছেলে নজির আহমদ (৪০) ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের নয়াপাড়ার মোহাম্মদ জাকারিয়ার ছেলে গিয়াস উদ্দিন (৩০)। অন্যদিকে সাবরাং এলাকায় বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন সদর ইউনিয়নের ডেইল পাড়ার কালু মিয়ার ছেলে আব্দুল শুক্কুর (৫০) ও তার ছেলে মোহাম্মদ ইলিয়াছ (৩০)।
এসময় তাদের কাছ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ইয়াবা ও ৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এরা সবাই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বলে দাবি করে পুলিশ ও বিজিবি।
র‌্যাব ও বিজিবির ভাষ্য মতে, কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের সময় গত এক মাসে (ফেব্রুয়ারি) র‌্যাব-১৫ এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ৪৬ হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করে। এছাড়া মাদক কারবারিদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এক জন নিহত হয়। এসব ঘটনায় ২টি অস্ত্রসহ সাত জনকে আটক করা হয়। তার মধ্যে তিন জন রোহিঙ্গা। অন্যদিকে বিজিবির সদস্যরা গেল মাসে ৩ লাখ ৭১ হাজার ২৭৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। বিজিবি এসব ঘটনায় ৪১টি মামলা ও ২৬ জনকে আটক করে।
এদিকে, দীর্ঘ দিন পুলিশের ‘সেফহোমে’ থাকার পর ১৬ ফেব্রুয়ারি ইয়াবা-অস্ত্র নিয়ে স্বেচ্ছায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের সামনে আত্মসমর্পণ করে ১০২ জন ইয়াকারবারি। তখন ধারণা করা হয়েছিল, এই উদ্যোগের পর টেকনাফে মাদক ব্যবসা বন্ধ হবে। বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সংখ্যাও কমবে।
তবে এখন নতুন নতুন রুট ব্যবহার করে সমুদ্রপথে কারবারিরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সমুদ্রপথে পাচারের সময় এক লাখ পিস ইয়াবাসহ মিয়ানমারের ১১ নাগরিককে আটক করে কোস্টগার্ড। তাছাড়া টেকনাফে ইয়াবারোধে কড়াকড়ি জারি থাকায় মাদক কারবারিরা রুট পরিবর্তন করছে। এখন মিয়ানমার থেকে সরাসরি সমুদ্রপথে ও অন্যান্য রুটে ইয়াবা বড়ি কক্সবাজার, মহেশখালী, চট্টগ্রাম, পতেঙ্গা, আনোয়ারা, কুমিল্লা, সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে।
টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের (বিজিবির) অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুদ-জামান চৌধুরী কক্সবাজার নিউজ ডটকম (সিবিএন)কে জানান, ‘মাদক ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ইয়াবা বন্ধে বিজিবি সদস্যরা জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’
১ মার্চ পৃথক বন্দুকযুদ্ধে চারজনের মৃত্যর ঘটনা ছাড়াও ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে টেকনাফের খারাং খালি তিন নম্বর স্লুইস গেইট এলাকায় বিজিবির ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বিল্লাল হোসেন (৩৮) নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন।
২২ ফেব্রুয়ারি ভোরে দমদমিয়ায় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন নুরুল আলম (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা। তার বিরুদ্ধে ডাকাতির অভিযোগ থাকার কথা বলেছে র‌্যাব। একই দিন সাবরাংয়ের কাটাবুনিয়ায় বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ বেল্লাল হোসেন (২৫) নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন।
৫ নম্বর স্লুইস গেট এলাকায় ২০ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ জাফর আলম (২৬) নামে এক রোহিঙ্গা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান।
৫ ফেব্রুয়ারি মহেশখালীতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শাহাব উদ্দীন নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। ২৮ জানুয়ারি গোলাগুলিতে মাদক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (২০) ও মোহাম্মদ রফিক (৫৫) নিহত হন বলে জানা গেছে।
এর আগে ২৪ জানুয়ারি টেকনাফে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই জন ইয়াবা ব্যবসায়ী এবং মহেশখালীতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’এক ডাকাত নিহত হয়।
২১ জানুয়ারি টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী সামসুল আলম পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়। টেকনাফ পৌরসভার উত্তর জালিয়াপাড়ায় ২০ জানুয়ারি বিজিবি ও পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মোস্তাক আহমদ ওরফে মুছু (৩৫)। এছাড়া ৪ থেকে ১২ জানুয়ারি কক্সবাজারে নিহত হয়েছে আরও ৯ জন মাদক ব্যবসায়ী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •