মোঃ ফারুক ,পেকুয়া :

পেকুয়া উপজেলা সদরের দূর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা বিলহাচুরা গ্রাম। নদী বেষ্টিত এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল মাছ ও লবণ উৎপাদন কাজে। শিক্ষার মানে একটু পিছিয়ে থাকলেও শান্তি সম্প্রীতির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল এ গ্রাম।

কিন্তু একটি চিংড়ীঘের জবর দখলকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দুইজনের মৃত্যু ও সাতটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় এ গ্রামে এখন শুধুই আতংক বিরাজমান। পুলিশের দায়েরকৃত অস্ত্র আইনের একটি মামলা ও দুটি হত্যা মামলায় ইতিমধ্যে পুরুষ শুন্য হয়ে পড়েছে গ্রামটি। দায়েরকৃত মামলাটি নিয়েও বির্তকের ঝড় উঠেছে বলে সাধারণ সচেতন মহলের সাথে কথা বলে প্রতীয়মান হয়। পুলিশের বিচক্ষণতার ও দায়িত্বে অবহেলাও ফুটে উঠেছে স্থানীয়দের বক্তব্যে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে এ গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে সাবেক ইউপি সদস্য মমতাজ উদ্দিন গংয়ের ৪০ বছরের ভোগদখলীয় চিংড়ি ঘেরটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে জবরদখলের চেষ্টা চালায় স্থানীয় একটি পক্ষ। তাদের হামলায় ঘটনাস্থলে নিহত হয় চিংড়ি ঘেরটির পাহারাদার নেজাম উদ্দিন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নেজাম উদ্দিনের মরদেহ ও হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করে।

মমতাজ উদ্দিনের মা মোহনা বেগম বলেন, আমার ছেলেরা নির্দোষ। তারা কোন মারামারি করেনি। কিন্তু আমার ছেলেদের ফাঁসাতে প্রতিপক্ষরা আজিজুল হক প্রকাশ রাখাল নামের তাদের নিজেদের একজন লোক নিজেরা হত্যা করে। ওই ঘটনায় তারা এলাকার অনেক নিরহ মানুষসহ আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছে। মামলার কারণে আমার ছেলে, নাতী ও বয়োবৃদ্ধ স্বামী সবাই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এদিকে সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকিতে আমরা নারীরাও রয়েছি চরম আতংকে।

নিহত নেজাম উদ্দিনের স্ত্রী বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ওই চিংড়িঘেরের পাহারাদার হিসেবে চাকরি করে আসছিল। তিনি চিংড়িঘের মালিকের খুব অনুগত ছিলেন। তার এ আনুগত্যের কারণে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিল দখলবাজ সন্ত্রাসী জালাল, সাহাব উদ্দিন ও আলমগীর বাহিনী। চিংড়িঘের জবরদখল চেষ্টাকারীদের পক্ষ থেকে হুমকি থাকলেও তিনি পিছপা হননি। প্রতিদিন চলে যেতেন ঘের পাহারা দিতে। গত শনিবার প্রতিপক্ষের অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারায় আমার স্বামী। তাকে জানে মারার পরেও হামলাকারীরা তার মৃতদেহের উপর চালিয়েছে পাশবিক নির্যাতন। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়া হয় তার গোপনাঙ্গ।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আরিফুল ইসলামের স্ত্রী নিলু আরা বেগম বলেন, আমার স্বামী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাঁর অপর ভাই মমতাজ সাবেক জনপ্রতিনিধি। দুজনই যথেষ্ট জনপ্রিয়। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুল কেউ তুলতে পারবেনা। তারা শান্তপ্রিয় মানুষ। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের ভোগদখলীয় চিংড়িঘেরটি কিছুদিন ধরে চাঁদার দাবীতে জবরদখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে স্থানীয় জালাল উদ্দিন নামের এক চিহ্নিত সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের অনৈতিক দাবী ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। তাঁদের অপকর্ম গুলোর বিরুদ্ধে আমাদের পরিবার সবসময় আইনের আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সাথে কখনো সংঘাতে জড়ায়নি। কিন্তু সংঘবদ্ধ ওই সন্ত্রাসী বাহিনী আইনকে তোয়াক্কা না করে সবসময় সংঘাতের চেষ্টা চালিয়েছে। গত শনিবার সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে আমাদের চিংড়িঘেরে হামলা চালায়। চকরিয়া থেকে চারটি গাড়ী নিয়ে একদল সন্ত্রাসী এসে হামলায় অংশ নেয়। পরে সেসব গাড়ীসহ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করেছে পুলিশ। ওইদিন যখন সন্ত্রাসীরা আমাদের আক্রমণ করে, তখন আমাদের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের সহায়তা নিয়েছে। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার আগেই সন্ত্রাসীরা পাহারাদার নেজামকে হত্যা এবং আমার ছেলে মোহাম্মদ শওকতকে মারধরে গুরুতর জখম করে।

সাবেক ইউপি সদস্য মমতাজ উদ্দিনের স্ত্রী জয়নাব বেগম বলেন, সন্ত্রাসীদের আক্রমণে আমরা আক্রান্ত হয়েছি। কিন্তু এখন আমরাই অভিযুক্ত। হয়রানীর শিকার। ওই সন্ত্রাসীদের বসতভিটে থেকে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ আমাদের নিরপরাধ ছেলে ওয়াহিদ ও শহিদকে আটক করে নিয়ে গেছে। অথচ তারা পুলিশের অভিযানে সহায়তা করেছে। যার ভিডিওচিত্র আমাদের কাছে রয়েছে। এখানে আরো হাস্যকর বিষয় হলো যে বহিরাগত সন্ত্রাসী ভাড়া করে এনেছিল জালাল ও আলমগীর বাহিনী সেটা পুলিশসহ স্থানীয় শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। আরো মজার ব্যপার হলো আলমগীরের আতœীয় আবুল কালামের সাথে মগনামা ইউনিয়নের বাইন্যা ঘোনা এলাকার নুরুল আবছারের পুত্র নুরুল আজিমের সাথে জায়গার বিরোধ চলে আসছিল কিন্তু সেখানে আজ আমার পরিবারের সাথে ওই নিরীহ ব্যক্তি আজিমকে হত্যা মামলার আসামী করা হয়। সুতরাং এ থেকে বুঝা যায় না তাদের এ হত্যাকান্ড ও মামলা পূর্ব পরিকল্পনায় ছিল? তাই আমি পুলিশসহ সচেতন মহলের কাছে আকুতি জানাচ্ছি নিরপেক্ষ ও সুষ্ট তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হউক।

তিনি আরো বলেন, পাহারাদার নেজামকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। যা এলাকাবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু রাখাল নামের একব্যক্তি যে নিহত হয়েছে, তাকে কে মেরেছে বা কিভাবে মরেছে তা কেউ দেখেনি। কিন্তু তার মৃত্যু দায় এখন তুলে দেয়া হয়েছে আমাদের পরিবারের নিরহ সদস্যসহ অসহায় এলাকাবাসীদের উপর। হামলাকারীরা ওইসময় শতাধিক রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। তাদের ছোড়া গুলিতে তো সে মারা যেতে পারে। তাই আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করবো, দয়াকরে বিষয়টি খতিয়ে দেখুন। সত্য তুলে আনুন। নিরপরাধীদের মুক্তি দিন।

এব্যাপারে জানতে চাইলে পেকুয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাকির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, মামলা গুলো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না গেলে, অবশ্যই অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়া হবে। তবে সত্যতা মিললে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •