cbn  

ইমাম খাইর, সিবিএন:
প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে কোন ধরণের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ, তারপরও প্রকাশ্যে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থায়ী স্থাপনা। এরমধ্যে অধিকাংশই আবাসিক হোটেল। এসব হোটেলে জেলা প্রশাসন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের নেই কোন ছাড়পত্র। অথচ উপকূলীয় ও জলাভূমির জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৫ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুসারে সংকটাপন্ন ওই এলাকায় সরকারি অনুমোদন ব্যতীত সব ধরনের ভৌত নির্মাণকাজ, নির্মাণকাজে পাথর ও প্রবাল শিলার ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া গড়ে ওঠা সকল স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলতে; ভবিষ্যতে যেন পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোন স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে; কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে হাইকোর্টের। চার সচিব, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ ১১ সরকারী কর্মকর্তাকে ২০১১ সালের ২৪ অক্টোবর এ নির্দেশনা দেন।
অথচ গত ২৪ ফেব্রুয়ারী সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সেন্টমার্টিনের পশ্চিম পাড়া সমুদ্র সৈকতের পাশে পাশেই একটি স্থায়ী পাকা ভবনের নীচতলার নির্মাণ কাজ চলছে। কাজ করছেন ৬/৭ জন শ্রমিক। স্থানীয় লোকজন জানান-ওই ভবনটি নির্মাণ কাজ শেষে আবাসিক হোটেল হিসাবে চালু করা হবে। নির্মাণ শ্রমিক আব্দুল কাদের জানায়, ‘ প্রায় ১৫/২০ দিন ধরে এ ভবন নির্মাণের কাজ করছি। কেউ কখনো কাজে বাধা দেয়নি।’
হোটেলটি নির্মাণের বৈধতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় আমি বলতে পারবো না। মালিক পক্ষই তা ভাল বলতে পারবেন।
একইভাবে পশ্চিম কোনাপাড়া সৈকতের সাথে লাগোয়া ‘রিসোর্ট লাবিবা বিলাস’। সেখানেও দেখা গেল তৃতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে প্রকাশ্যে। ৭/৮ জন শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন। শ্রমিক আবু তাহের বলেন, ‘দুই তলা পর্যন্ত কাজ শেষ করে হোটেল ব্যবসা চলছে। এখন চলছে তৃতীয় তলার কাজ।’ রিসোর্টের ম্যানেজার আবদুস সালাম বলেন, ‘আমি রিসোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি নির্মাণ কাজ দেখাশুনা করি। এখন হোটেলটি তিন তলা করা হচ্ছে। আমাদের কেউ কখনো বাধা দেয়নি।’
শুধু এ দু’টি স্থাপনা নয়, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধভাবে প্রতিদিন প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে গড়ে উঠছে একের পর এক স্থাপনা। এখন সেখানে হোটেল রিসোর্ট লাবিবা বিলাস, সমুদ্র কুটিরসহ ৮/৯টি ছোট-বড় স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। গত তিন বছরে সেখানে অবৈধভাবে অর্ধশতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
অবাক করা বিষয় হলো দেশের প্রচলিত আইন উপেক্ষা করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া এসব স্থাপনা নির্মাণের কোন অনুমোদন নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে ইসিএ এলাকায় এভাবে স্থাপনা নির্মাণ কাজ চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য দায়সারা।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘হোটেল ফ্যান্টাসি, রিসোর্ট লাবিবা বিলাস, সমুদ্র কুটিরসহ যেসব হোটেল গড়ে উঠছে তাদের বাধা দিয়েও থামানো যাচ্ছে না। একদিকে বাধা দিলে আরেক দিকে কাজ শুরু করে। কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণ সামগ্রীও জব্দ করা হয়েছিল। কিন্তু তারা ঠিকই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্রভাবশালীদের জন্য স্বয়ং প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উল্টো চাপ প্রয়োগ করেন।’
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো: মোয়াজ্জম হোসাইন বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সেখানে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আইন লঙ্ঘন করে শতাধিক হোটেল-মোটেল তৈরি হয়েছে। লোকবল সংকটের কারণে কক্সবাজার শহর থেকে সেন্টমার্টিনে গিয়ে এসব তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। এরপরও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘ সেন্টমার্টিনে কয়েকদিন পর পর বিভিন্ন নির্মাণ কাজ বন্ধ করা হচ্ছে। অবৈধ ভাবে স্থাপনা নির্মাণ যেকোন মূল্যে বন্ধ করা হবে। সেখানে কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও ছাড় দেয়া হবে না। একই সাথে আদালতের নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’
সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) সেন্টমার্টিন দ্বীপে স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলেই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের একটি চক্রকে ম্যানেজ করতে হয়। এসব দপ্তরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজসে প্রকাশ্যে টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটারের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইট, লোহা, সিমেন্ট, বালিসহ যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছে যায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ম্যানেজ থাকায় এসব নির্মাণ সামগ্রী নির্বিঘ্নে নির্মাণ স্থলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর সেখানেও কোন বাধা ছাড়াই হু হু করে গড়ে উঠছে হোটেল, কটেজ ও রেঁেস্তারা। এভাবে অবৈধ পন্থায় একের পর এক স্থাপনা গড়ে উঠায় প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ওই দ্বীপের ভবিষ্যত ঝুঁকিতে ফেলেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রণমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) কক্সবাজারের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইন ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা স্বত্ত্বেও সেন্টমার্টিনে প্রকাশ্যে স্থাপনা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে দ্বীপটি ঝুঁকিতে পড়েছে। ইতিমধ্যেই দ্বীপটির একাংশে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। দ্রুত এসব রোধ করা না গেলে দ্বীপটিতে যে কোন সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি’র (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আদালতের সুষ্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সেন্টমার্টিনে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, মোটেলসহ নানা স্থাপনা। আদালতের নির্দেশ প্রদানের পাঁচ বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সেন্টমার্টিন ও এর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যর্থতা দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম অবজ্ঞা ও উদাসিনতার পরিচায়ক। একইসাথে আদালত অবমাননার সামীল।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •