তাওহীদুল ইসলাম নূরী

আমাদের দেশপ্রেম, মাতৃভাষা প্রীতি এবং দেশমাতৃকার কল্যাণে আত্মত্যাগের উজ্জ্বল ভাস্বর একুশে ফেব্রুয়ারি। বিশ্বে আমাদের যে কয়টি স্বীকৃতি, একুশে ফেব্রুয়ারি তার মাঝে অন্যতম একটি। আর তাই তো ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবীতে আত্নদানকারী সালাম,রফিক, বরকত,জব্বার, অহিউল্লাহ- এখন শুধু আমাদের নয়,সমগ্র বিশ্বের ভাষাপ্রেমী এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়া কোটি কোটি বিপ্লবীর নিকট প্রেরণা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

মাতৃভাষা কী? : সাধারণত মানুষ মায়ের কাছ থেকে যে ভাষায় কথা বলতে শিখে তাই মাতৃভাষা। অন্যভাবে বলা যায় যে,জাতিগত কিংবা জন্মসূত্রে মানুষ যে ভাষার অধিকারী হয় সেটাই মাতৃভাষা। তাইতো এই মাতৃভাষা মানুষের কাছে মায়ের মতই অস্থিত্বের অংশ।

ইতিহাস যা বলে: ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্র কাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সাথে ইংরেজদের সংঘটিত যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। দীর্ঘ ১৯০ বছর ইংরেজরা আমাদের শোষণ করে। এ পরিস্থিতিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগষ্ট ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ। একটি পূর্ব পাকিস্তান, অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান।

কেন এই ভাষার আন্দোলন : সাড়ে বারশ মাইল দূরত্বে অবস্থিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একদেশে একীভূত হওয়া ছিল কল্পনাতীত। তাই, হৃদয়ে ‘না,না,না’ সত্ত্বেও তৎকালীন বাংলার জনগণ অন্তত ব্রিটিশদের শোসন থেকে মুক্তি পেতে দ্বি জাতি তত্বের ভিত্তিতে এই দেশ গঠন মেনে নেয়। কিন্ত,কয়েক মাস যেতে না যেতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা একে একে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সামরিকসহ সর্বক্ষেত্রে ব্রিটিশদের চেয়েও বেশী বৈষম্য সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ওরা আঘাত হানে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার উপর।

অবস্থা যেমন হয়েছিল : পূর্ব ও পশ্চিম এ দু’য়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৫৬% এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল ৪৪%। পূর্ব পাকিস্তানীরা তাদের মাতৃভাষা বাংলা আর পশ্চিম পাকিস্তানেরীরা উর্দু ভাষায় কথা বলে। কিন্ত, পশ্চিম পাকিস্তানীরা উর্দুকেই সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার হীন চেষ্টায় মেতে উঠে। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভা এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে “উর্দু এবং উর্দুই হবে বাংলার একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”৷ কিন্ত,এ দুই সভাস্থলেই উপস্থিতির অধিকাংশ ‘না,না’ বলে এর প্রতিবাদ জানায়।

জিরো টলারেন্সে শাসক: “যে করেই হোক রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” শ্লোগান নিয়ে যখন বাংলা ভাষাপ্রিয় জনগণ এগিয়ে যাচ্ছিল,তখনই জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করে তৎকালীন পাকিস্তানের শাসক নামের শোষক সরকার। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই ‘ দাবীতে সারাদেশে সভা এবং হরতাল ও ভাষা দিবস হিসেবে দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্ত, সরকার এ পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ মার্চ অর্থাৎ ১ মাসের জন্য সভা,সমাবেশ ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করে। কিন্ত, এ ঘোষণার পর পরই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৪ ফেব্রুয়ারির ঘোষণা অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সারাদেশের জনগণকে হরতাল,সভা,সমাবেশের মাধ্যমে ভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের আহবান জানান।

সেদিন যা হয়েছিল : ২১ ফেব্রুয়ারি প্রভাতের উদয় হওয়ার সাথে সাথে বাংলার দামালরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। ফলে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি আরও বেড়ে যায়। সরকারের নির্দেশে মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। প্রাণ হারায় সালাম,রফিক, বরকত, জব্বরসহ অনেকে। পরের দিন নিহত হয় অহিউল্লাহর মত নির্দোষ বালক। গুম হয়,অঙ্গ হারায় আরও অনেকে।

নিধুয়া পাথার কেমনে হলো পার:
বাঙালিরা লড়তে জানে,হারতে নয়। সেদিন তারা সালাম,রফিক,বরকত,জব্বর অহিউল্লাহদের মৃত্যুতে একটু কেঁদেছিল ঠিক,কিন্ত কান্নার এই শোককেই শক্তিতে পরিণত করে হিমালয় থেকে সাগর পর্যন্ত অবস্থানরত তৎকালীন সকলেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে বহুগুণে জেগে উঠে। বাংলা মায়ের দামালদের আত্মত্যাগ এবং সকলের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা অবশেষে মূল্যায়িত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙ্গালী এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য বয়ে আনে সীমাহীন গৌরব আর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস।

আন্দোলনের বীজ হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি :
কবির ভাষায় বলতে হয়
“একুশ মানে বাংলার ইতিহাস,
একুশ আমার অহংকার,
একুশ মোদের সংগ্রামী চেতনা।
বাঙ্গালী মাথা নোয়াবার নয়,
ডরের নয়,বীরের জাতি
একুশ তার উজ্জ্বল পরিচয়”।
সত্যি,একুশের মাধ্যমে বাঙ্গালীর জাগরণের সূচনা। কোনভাবেই যে আমরা মাথা নোয়াতে আমরা জানি না,একুশ বিশ্বের বুকে আমাদের সে পরিচয়টাই তুলে ধরে। একুশের ফল পরবর্তীতে বই জ হিসেবে কাজ করে ৬৬’এর ছয় দফা, ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১’এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০’এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। মুলত প্রতিটি আন্দোলনে সফলতার পিছনে একুশ কাজ করেছে জাগরণ, প্রেরণার আশার উৎস হিসেবে।

এই যে আমাদের আজকের মাতৃভাষা বাংলা। এটা অনান্য ভাষার মত নিছক একটি ভাষা নয়। এই একটি ভাষায় মিশ্রিত আছে সালামের বাবা মায়ের বুক ফাটা কান্না, জব্বারের স্ত্রীর স্বামী হারা বেদনা,অহিউল্লাহর বোনের ভাই হারা বিলাপের করুণ সুর। তাই,অনেক ত্যাগে অর্জিত এই ভাষা নিয়ে শুধু ফেব্রুয়ারি মাস আসলে নয় অন্য সময়েও চাই এর আলোচনা, যথার্থ মূল্যায়ন।
সেদিন যে উদ্দেশ্যে ভাষা সৈনিকরা নিজেদের বিসর্জন দিয়েছিল,কালো রাজপথকে রঞ্জিত করেছিল, তা আজও পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয় নি। সরকারী,বেসরকারী নানাক্ষেত্রে এখনও ইংরেজিসহ অনান্য ভাষার যেখানে প্রাধান্যতা,সেখানে বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা লক্ষণীয়। বাংলা ভাষার জন্য বাংলা ফাল্গুন মাসের ০৮ তারিখ ভাষা শহীদরা নিজেদের বিসর্জন দিয়েছেন, অথচ প্রতিবছর পালিত হয় ইংরেজি ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ।
যে কয়টা কারণে বিশ্বের বুকে আমাদের পরিচিতি,তারমধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যতম একটি। তাই, এই যে আমাদের আজকের বাংলা ভাষা, কোনভাবেই যেন এর বিকৃতি কিংবা বিলোপসাধন না হয় এজন্য সবাইকে তৎপর থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে এই একটি ভাষায় মিশ্রিত আছে অনেক তাজাপ্রাণ,অনেক স্বজন হারার বেদনা, বহু পঙ্গুর আবেগ এবং ভাষা আন্দোলনে গুম হওয়াদের পরিবারের আহাজারি। তাই পরিশেষে কবির ভাষায় বলি
“ত্যাগ,কষ্ট সয়ে মুক্তির প্রেরণা, একুশকে কবু ছোট করো না।”
শতাব্দী থেকে শতাব্দী অক্ষয় থাকুক বাংলা ভাষা,
অমর হোক সকল ভাষা সৈনিক।

লেখক :
তাওহীদুল ইসলাম নূরী,
আইন বিভাগ(অধ্যয়নরত),
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম। শাহারবিল সদর, চকরিয়া,কক্সবাজার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •