– খালেদুল হক

অনেক পেরেশান ও বাস্তবতার নিরিখে আজকের এই লিখা।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে সেশনজট। শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময় অকারণেই নষ্ট হচ্ছে এর কারণে। অনেক সময় এরকমও তথ্য আমি পেয়েছি যে বিদেশে ভর্তি হতে গেলে শিক্ষার্থীকে কেন তার চার বছরের ডিগ্রি নিতে সাত বা পাঁচ বছর লাগল তার জন্য রীতিমতো ব্যাখ্যা দিতে হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চতর শিক্ষা নিতে গিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা দেখে তাদের সতীর্থরা বয়সে অনেক ছোট। কিছু কিছু একাডেমিক বৃত্তিতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সুযোগ হারায় বয়সের কারণে। ওদিকে সেশনজটের ফলে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে বিলম্ব ও পরিবারের আর্থিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার সমস্যাগুলো তো রয়েছেই।
সেশনজট বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি খারাপ মাত্রা যোগ করেছে। একটি হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডিগ্রি না হওয়া। আরেকটি হল, অনিয়মিত একাডেমিক সাইকেল।
আমি যেখানকার ছাত্র, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্যারেরা চেষ্ঠা করলেও সিলেবাস শেষ না হওয়ার দোহায় দিয়ে পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার দাবী জানায় ছাত্ররা। অথচ এক্ষেত্রে যদি বছরের শুরুতেই একডেমিক ক্যালেন্ডার থাকতো!!

পৃথিবীর যে কোনো দেশেই একাডেমিক সেশন শুরুর সময়, পরীক্ষা, ফলাফল, ছুটি সব পূর্বনির্ধারিত।
বাংলাদেশে কোনো উপাচার্যের পক্ষেও বলা সম্ভব নয় যে, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বর্ষে কখন পরীক্ষা হয়ে গেছে, কোনটার ক্লাস চলছে, কোনটির ফলাফল দেওয়া হল। অথচ দুই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় সব নিয়মিত ছিল। প্রথম থেকে চতুর্থ, সকল বর্ষের ক্লাস একযোগে অনুষ্ঠিত ও শেষ হয়েছে; পরীক্ষাও হয়েছে একযোগে। পরীক্ষা শেষে ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের বাড়ি চলে গেছে বেড়াতে। শিক্ষকরা পেয়েছেন অখণ্ড অবসর, দ্রুত দেখে ফেলেছেন পরীক্ষার খাতা। ছাত্রছাত্রীরা ফিরে এসে দেখেছে তাদের ফলাফল হয়ে গেছে মাত্র বাইশ দিনের মধ্যে। আবার শুরু হত নতুন বছরের ক্লাস।
বর্তমান চিত্র হচ্ছে, একেক ব্যচের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা একেক সময় হয়। হয়তো প্রথম বর্ষ ও চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে কিন্তু দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা নেই। একই রুম শেয়ার করা শিক্ষার্থীরা এর ফলে সমস্যায় পড়ে।
ফি বছর সব বর্ষের পরীক্ষা একযোগে অনুষ্ঠিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির চরিত্রও পাল্টে যেত। সে ক্ষেত্রে সাংগঠনিক তৎপরতাগুলো নিয়মের মধ্যে চলে আসত। মিছিল, প্রচারণা ও কাউন্সিল এসব কর্মকাণ্ড পরীক্ষার সময় বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত হত।
সারা বছর ধরেই অনিয়মিতভাবে পরীক্ষা ও ক্লাস চলার কারণে দেখা যায়, প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পনের দিনের মধ্যেই দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শুরুর ঘোষণা দিল সংশ্লিষ্ট বিভাগ কিংবা ডিনের দপ্তর। এই পনের দিন ছাত্রছাত্রীরা কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। অনেক সময় বর্ষা বা চরম গ্রীষ্ম হওয়ার কারণে কোথাও যেতে পারে না তারা। বিষণ্ণ দিন কাটানো ছাড়া আর উপায় থাকে না।
অথচ ষাটের দশকে শিক্ষার্থীরা পরের বছরের ক্লাস শুরু হওয়ার মাঝের সময়টুকু গ্রামের বাড়িতে বাবা মায়ের সঙ্গে কাটিয়ে আসত। এতে পারিবারিক সংহতি বাড়ত। মূল্যবোধের জায়গাগুলো শাণিত থাকত। দীর্ঘ পরিবার-বিচ্ছিন্নতা মূল্যবোধের জায়গায় ঘুণ ধরায়; পরিবারের সঙ্গে চাপ শেয়ার করতে না পারায় মাদকদ্রব্য ব্যবহার বা রুক্ষ আচরণের প্রবণতা বেড়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট কমানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত কয়েক বছর ধরে রোজার ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি সঙ্কুচিত করা হয়েছে। কিন্তু যে রথী মহারথীরা দেশ উদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে এসব করছেন তাদের শিক্ষাদর্শনে জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয়। শিক্ষা মানে অবিন্যস্ত উপায়ে কিছু বই পড়া আর পরীক্ষা দেওয়া নয়। যে সমস্ত ছুটি শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সে সব ছুটি বিশ্রাম, মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য প্রয়োজন। উচ্চতর শিক্ষা একটি মানসিক চাপপূর্ণ শিক্ষা। অবসর, ছুটি ও বিনোদন সেটি আত্মস্থ করার জন্য খুব প্রয়োজন।
শিক্ষা চলাকালীন ক্যারিয়ার পরিকল্পনার জন্যও দরকার ছুটি। এ সময় দেশভ্রমণ কিংবা নিজ গ্রামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশলে শিক্ষার্থী দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে। না হলে একজন বিচ্ছিন্ন আত্মমুখী মানুষ হয়ে উঠতে পারে সে।
সেশনজটের কারণে শিক্ষকদের পেশাগত ও ব্যক্তিজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা সম্পর্কে অনেকেই ভাবেন যে, এটি হল আরামের চাকরি; দিনে একটি কিংবা সপ্তাহে দুটি ক্লাস নিতে হয়। এই জাতীয় ছেলেমানুষীপূর্ণ ভাবালুতা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হয় শিক্ষকতার। মূলত, বাংলাদেশে শিক্ষার ঐতিহ্য বেশি দিনের নয় বলে এসব যুক্তিহীন ভাবালুতার চল হয়েছে। শিক্ষকতা একটি পেশা হিসেবে দেখলে বোঝা যাবে এখানে দায়িত্ব পালন কত কঠিন; সে তুলনায় প্রাপ্যতা বাংলাদেশেরই অন্য অনেক পেশার চেয়ে কম। অনিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার কারণে শিক্ষকরা সব সময় চাপে থাকেন। পরীক্ষার হলে ডিউটি, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নিতে গিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয়। একটি ব্যাচের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর খাতা মূল্যায়নের জন্য আলাদা করে সময় পাওয়া যায় না। কারণ তখন তিনি হয়তো আরও কোর্স পড়াচ্ছেন। এর ফলে শিক্ষকদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়।
সারা বছর ধরে পরীক্ষার চাপ থাকার আরেকটি কুফল দেখা যায় শিক্ষকদের গবেষণাকাজে। শুধু পরীক্ষার খাতা দেখাই নয়, বিবিধ পরীক্ষা কমিটিতে থেকে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সম্মার্জনা ও ছাপানোর কাজও শিক্ষকদের করতে হয়। সেশনজট যখন ছিল না তখন এ সমস্ত কাজ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় করতে হত। এখন করতে হয় সারা বছর।
সেশন শুরু ও শেষের তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হওয়ার ফলে বহু শিক্ষক তাদের প্রাপ্য শ্রান্তিবিনোদন ছুটি ভোগ করতে পারেন না। সেশনজটের শুরু আশির দশকে, স্বৈরশাসনের সময়। তখন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সরকারের উচ্চ মহলের নির্দেশে অনেক বার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি ঘোষণা করার এখতিয়ার একমাত্র সিণ্ডিকেটের। এসব স্বৈরতান্ত্রিক অবৈধ ছুটির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা এলোমেলো হয়ে যায়। এর রেশ সেশনজট আকারে বহন করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, আজও। এর জন্য কোনোভাবেই শিক্ষকরা দায়ী নন।
এর সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাস ও ছাত্রহত্যার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বন্ধ থাকা। উপাচার্যদের বিতর্কিত ও অবৈধ কর্মের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

তাহলে সমাধান কী?
সমাধান হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মোটামুটিভাবে স্বায়ত্বশাসিত, সুতরাং বেধে দেওয়া বা চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম-কানুন কতটুকু কার্যকর হবে ?
তবে, কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় রাখলে অপেক্ষাকৃত ভালভাবে চলতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ঃ
১-অন্যান্য দেশের মতো আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও যেনো একাডেমিক ক্যালেন্ডার থাকে,যেখানে উল্লেখ থাকবে সব বিভাগের পরীক্ষার রুটিন।
২-যেখানে সম্ভব ছাত্র-শিক্ষকদের হল নির্মাণ করা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক নেই এরকম হরতাল-ধর্মঘটগুলোতে ক্লাস চালিয়ে যাওয়া;
৩-সব মিলিয়ে জানুয়ারী থেকে মে এই ৫ মাসের মধ্যে একনাগাড়ে একবার সেমিস্টার ফাইনাল নেওয়া এবং একইভাবে গ্রীষ্মের বন্ধ সহ জুন -নভেম্বর এই ৬মাসের মধ্যে মাত্র একবার একনাগাড়ে দুই সপ্তাহ ছুটি এবং তার পরপরই অপর একটি সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা – এ ধরণের রীতি-নীতি চালু করলে হরতাল-অবরোধের কারণে নষ্ট হওয়া শ্রেণী কার্য্যক্রম উদ্ধার করা যায়। ঠিক একভাবে প্রথম পরীক্ষার দিন থেকেই খাতা কাটার জন্য শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করে সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হওয়ার পর এক বা দুই সপ্তাহ ছুটি দিয়ে শিক্ষকদের খাতা দেখা শেষ করে ফলাফল প্রস্তুতের জন্য নিয়ম বেধে দেয়া যায়;
৪-প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে ক্রেশ প্রোগ্রাম করে আগের জট কমিয়ে আনা।
৫- ছাত্রদের পরীক্ষা পেছানোর দাবী যাতে কর্তৃপক্ষ না মানা না হয়।

৬-সব বিভাগেই যেনো নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা শেষ হয় সেদিকে খেয়াল রাখা, অন্যথায় সারা বছরের প্যারা তো আছেই

৭- রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সেশনজটের সমস্যা একটি গুরুতর বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, যিনি একই সঙ্গে আচার্য, তিনি এটির সমাধানের জন্য উপাচার্যদের পরামর্শ দিতে পারেন। একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারেন। পাশাপাশি, বন্ধ করতে হবে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগদান। শিক্ষকদের কাছেও আশা করব, যেভাবেই কোনো পদে তাঁর নিয়োগ হোক না কেন, কোনো ছাত্র সংগঠনের তোষণনীতি বাদ দিয়ে তিনি একাডেমিক পরিকল্পনায় মনোযোগী হবেন। তবে এ-ও বুঝি, এই আকালের যুগে সে আশা না করাই ভালো।
সেশনজট স্বৈরশাসনের তৈরি ক্ষত। সেটি সারিয়ে তোলার জন্য সকলের সোচ্চার হওয়া উচিত। সেশনজট বন্ধ যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি হওয়ার দাবিদার বৈকি।

লেখকঃ খালেদুল হক ,ছাত্র, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •