শাহীন মাহমুদ রাসেল:
দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত কোনো পৃষ্ঠপোষক বা মূলহোতার গ্রেফতার অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। তাহ‌লে কি ধরে নিতে পারি, নিরপরাধ একরামকে হত্যা করে পুরো মাদকবিরোধী অভিযান এখানেই থেমে গেছে? কিছুদিন গাঢাকা দিলেও মাদকের পৃষ্ঠপোষকরা এখন আগের মতো বুক ফুলিয়ে প্রভাব বিস্তার করেই চলছে তাদের রমরমা ব্যবসা। ভেবেছিলাম নিরপরাধ একরামের জীবনের বিনিময়ে দেশ থেকে মাদক নির্মূল হয়ে যাবে, তাহলে কি ঐ প্রশ্নবিদ্ধ হত্যাকাণ্ডটিই পুরো মাদকবিরোধী অভিযানকে থামিয়ে দিয়েছে? -অভিব্যক্তি এক বিজ্ঞজনের।

সচেতন মহল মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী মাদকের ব্যাপারে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। যাকে বলে জিরো টলারেন্স। এ ছাড়া আর কোনো পথও ছিল না। যে হারে মাদকের বিস্তার ঘটছিল, তাতে এভাবে চললে জাতির মুখ থুবড়ে পড়তে সময় লাগত না। চারদিকে মাদক নিয়ে ঝড় বইছিল। পত্রপত্রিকায় মাদক নিয়ে নানা আশঙ্কার কথা লেখা হচ্ছিল। হবে না কেন, বন্যার পানির মতো ছেয়ে যাচ্ছিল এই মরণ নেশা ইয়াবা। গ্রামগঞ্জে পর্যন্ত এই নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল তরুণসমাজ।

এক জরিপে জানা যায়, দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ এই মরণ নেশা ইয়াবায় আসক্ত। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরই সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করে র‍্যাব। এ পর্যন্ত র‍্যাবের অভিযানে সহস্রাধিক ইয়াবা কারবারি গ্রেপ্তার হয়েছে। পাশাপাশি র‍্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে প্রায় ১৫০ জন ইয়াবা কারবারি মারা গেছে। তারা সবাই চুনোপুঁটি, পৃষ্ঠপোষকরা এখনো অধরা।

কক্সবাজার কলেজের ছাত্র মিজান বলেন, এ অভিযান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছিল দেশের জনগণের মধ্যে। অনেকের মতো আমিও অনেক খুশি হয়েছিলাম। তাদের যুক্তি, এই ইয়াবা কারবারিরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কিছুদিন জেলখানায় থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার আগের মতো নেশার কারবার খুলে বসে। তাই তারা বন্দুকযুদ্ধকে স্বাগত জানাচ্ছে। অন্যদিকে যাকে-তাকে ধরে নিরপরাধ একরামের মতো ইয়াবা কারবারি সাজিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে ক্রসফায়ারে হত্যা করে অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই অভিযান আর দৃশ্যমান নেই।

ঝিলংজা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শরীফ উদ্দিন মনে করেন, এযাবৎ যারা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই চুনোপুঁটি। বড় কোনো ইয়াবা কারবারি এ তালিকায় নেই। তাদের বেশির ভাগই ইয়াবা সেবনকারী, না হয় খুচরা বিক্রেতা। যারা পর্দার অন্তরালে থেকে এই কারবার চালিয়ে রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে বটবৃক্ষ হয়ে গেছে তারা আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তিনি আরও বলেন, মাদকের পৃষ্ঠপোষকরা ওপরতলায় বসে চালান পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়ে থাকে। তারা হাতে করে নেশার পুইরা বিক্রি করে না। তারা শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করে। তারা কেন খুচরা দোকানিদের মতো মাঠে ফেরি করবে? তাই তাদের কাছে ইয়াবা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা হাতঝাড়া। টলটলে পানির মতো পরিষ্কার। কারণ তাদের কাছে ইয়াবা নেই। ইয়াবা না থাকলে পুলিশ বা র‍্যাব তাদের ধরবে কিভাবে?

তাহলে অবধারিতভাবে চুনোপুঁটিরাই ধরা খাবে এবং বন্দুকযুদ্ধে মরবে। রাঘব বোয়ালদের কিছু হবে না। আইনের ফাঁকের মধ্যেই তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা আছে। এ জন্য বড় কারবারিরা নিশ্চিন্তে বুক ফুলিয়ে চলাচল করছে আর পালিয়ে বেড়াচ্ছে চুনোপুঁটিরা।

সারা দেশে এই সাঁড়াশি অভিযান চললেও কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে এখনো কোনো অভিযান চালানো হয়নি। শুধুমাত্র নিরপরাধ একরামকে হত্যা করা হয়। এখন পর্যন্ত বড় কোনো গডফাদার আটকের খবরও পাওয়া যায়নি। অথচ টেকনাফ বাংলাদেশের ইয়াবার গেটওয়ে হিসেবে পরিচিত। মিয়ানমারের প্রায় ৪০টি ইয়াবা কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবার চালান আসে একমাত্র টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে।

আমাদের যাঁরা বড় বড় আইনবিদ তাঁরা কেন বুঝতে পারেন না, গডফাদাররা হাত দিয়ে চালান ছুঁয়েও দেখে না। তারা নির্দেশ দেয় চোখের ইশারায়। তাহলে তাদের ধরার উপায় কী? সেই উপায় বের করতে হবে আগে। আইনের ফাঁক বন্ধ করে তাদের ধরার ফাঁদ পাততে হবে এবং তারা যেন আইনের ফাঁক গলে নিশ্চিন্তে বেরিয়ে যেতে না পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারির সংখ্যা ৬০ জন গডফাদারসহ মোট এক হাজার ১৫১। তাদের মধ্যে টেকনাফ-কক্সবাজারে রয়েছে ৯ শতাধিক কারবারি।

টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। দেশজুড়ে ইয়াবাবিরোধী অভিযান এখন আগের মতো তেমন চোখে পড়ছেনা, টেকনাফ সীমান্তে ইয়াবা গডফাদারদের মধ্যে কোনো ভীতি নেই। তাদের এই স্বাভাবিক জীবনযাপনে স্থানীয়দের বিস্ময় এ অভিযান নিয়ে ঠাট্টা করছে।

তাহলে এ অভিযানের ফলাফল কী? যদি আসল কারবারিরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে, তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যায় এ অভিযানের ফলাফল শূন্য।

যেহেতু গডফাদারদের ধরার আইনি বিধান নেই, তারা কেউ ইয়াবা বহন করে না। অতএব তারা ধোয়া তুলসীপাতা, নিরপরাধ। তারা আকাশে অবস্থান করবে, ঠাণ্ডা বাতাস খাবে আর ধরা খাবে এবং ক্রসফায়ারে মারা যাবে খুচরা বিক্রেতারা, অর্থাৎ ছোট কারবারিরা। এতে কি অদূর ভবিষ্যতে ইয়াবা আসা বন্ধ হবে?

প্রশ্ন হলো, কিভাবে বন্ধ হবে এই ইয়াবা আসা? কারণ যারা ইয়াবার চালান ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা তো পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে না। তারা থেকে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে। এ অভিযানে ভাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আবার শুরু হবে রমরমা কারবার। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে কিছু মানুষ। আর অসংখ্য পরিবার হবে নিঃস্ব। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ ধ্বংস হবে। মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে হতাশায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •