কাফি আনোয়ার

৩০ ডিসেম্বর মধ্যরাত। রাতের সুনশান নিরবতা ভেদ করে, ঈদগাঁওবাজারে ঘটে গেল একটি কোল্ড ব্লাডেড হত্যাকান্ড। নির্মম খুনের শিকার অসহায় রিকশাশ্রমিক আবদুল মজিদ। বাড়ি মাইজপাড়া, ঈদগাঁও। বয়স ৩০ এর ঘরে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের পর সারাদেশের মানুষ তখন ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন। কেউবা রাত জেগে প্রহর গুণছে নতুন ভোরের অপেক্ষায়। নতুন আশা-আকাংখা আর উদ্দীপনা বোঝাই নৌকা সোনালী আলোয় ভরে দেবে জীবনের পাওয়া না পাওয়ার বেদনা। মজিদও সেদিন বসেছিল সে আশায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেখতে দেখতে ।

মজিদ নিজে রিক্সাওয়ালা হলেও মনে-মননে-চেতনায় নৌকার পাঁড় অনুসারী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উত্তারাধিকারের অস্তিত্বরক্ষার যুদ্ধে এই মজিদও একজন বিপ্লবী কর্মবীর। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিরুদ্ধ চেতনার বাহক, নিজের রিকশাবাহনের মত করে এই রোরুদ্যমনা জাগরণী চেতনাকে জীবনব্যাপী বহন করে নিয়ে গেছে, গ্রামের মেঠোপথ, সড়ক থেকে মহাসড়কে, লোকালয় থেকে লোকহৃদয়ে।

মজিদের অন্ধ নৌকাপ্রীতি,আওয়ামী চেতনার এই পরিশুদ্ধ অবিভাজ্যতা যেনো সে রাতে তার যমদুত হয়ে নেমে এলো। ঘটে গেল নির্বাচন পরবর্তী সহিংস গুপ্তহত্যা। নিরুত্তপ্ত পরোক্ষ এক কথার জেরে হিংস্র হয়ে উঠেছিল খুনী। মজিদ বলেছিল নৌকা জিতে যাচ্ছে, ধানের শীষের মাথা খারাপ হয়ে যেতে পারে, চল তাডাতাডি, ঘরে চল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খুনী মহিউউদ্দীন একথা শুনে চেলাকাঠ দিয়ে মজিদের মাথায় উপুর্যপরি আঘাত করে ।

খুনী মহিউদ্দীন (বার্মাইয়া মহিউদ্দীন ) খুনের পর পগারপার। মামলা হলেও অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। পুলিশ বলছে, মজিদহত্যা মামলার একমাত্র আসামী খুনী মহিউদ্দীনের অবস্থান জানার সকল চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে মামলার তদন্তকার্য চলমান রয়েছে ।

মজিদ চোখমুদার পর তার পরিবার নেমে এলো ঘন অন্ধকার। রিকসার প্যাডেল ঘুরলেই ঘুরত সংসারের চাকা। সহায় সম্বল অবলম্বন বলতে ছিল ওই সবেধন নীলমনি জোড়াতালি দেয়া তিন চাকার যান। দু’চালা ঘরের একচালা দিয়ে দেখা যায় চাঁদ তারা সূর্য। রোদ আর বৃষ্টি সারা বছর গড়াগড়ি খায় স্যাঁতস্যাতে বারান্দায় ।

৩ সন্তানের ভরণপোষণ,অনটন,টানাপোড়েন আর জীবনের তাগিদ মেটাতে মেটাতে মেটানো হয়নি ঘরের চালের অনিবার্য আবশ্যকীয়তা। আজ কাল পরশু’র শেকলবন্দি প্রতীক্ষায় শেষমষ নিজেই আলিংগন করে নিল নির্মম মৃত্যুর করাল থাবা।

মজিদের বিধবা স্ত্রী বড় অসহায়, এতিম ৩ সন্তানের চাহিদা মেটাতে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার হাত প্রসারিত করছে।

মজিদের যানাযায় পাড়া,পড়শীদের কত আশ্বাস, এটা সেটা করে দেওয়ার ওয়াদা। সবই যেন কথার কথা। তবুও সমাগত মুসল্লীদের খয়রাতিপ্রাপ্ত ১৯ হাজার টাকা কিছুটা হলেও ক্ষণিকের অভাব মিটিয়েছে। এখন বিধবা ঘাড়ে জীবনের বোঝা। তার আকুল আকুতি মজিদ হত্যার বিচার যেনো অজানা অচেনা হিমঘরে শীতল হয়ে না পজাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের পর ডে। মজিদের এই যেন কখনো নির্মম নিয়তির করুণ উপহাসে পরিণত না হয়।

সে অকুলপাথারে দিগি¦দিক । কে দেবে আশা ? কে দেবে ভরসা? কে শোনাবে এতটুকু সান্ত¦নার আপ্তবাক্য?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •