সিবিএন ডেস্ক
বিশ্বের ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ মানসিক অথবা আচরণগত সমস্যায় ভুগছে। এদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রতিবছর আত্মহত্যা করছে। ২০১৮ সালের হিসাব অনুযায়ী এই তথ্য জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মানসিক রোগের ছয়টি প্রধান কারণের মধ্যে চারটি হচ্ছে— বিষণ্নতা, অতিরিক্ত মদ্যপান, সিজোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিজঅর্ডার। বিশ্বের প্রায় ৯ কোটি মানুষ মদ্যপান বা ড্রাগজনিত অসুস্থতায় ভুগছে। বিশ্বে প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে একজন মানুষ মানসিক রোগে আক্রান্ত, পাঁচ কোটি মানুষ মৃগী রোগে ভুগছে। এরমধ্যে ৮০ ভাগ রোগীই উন্নয়নশীল দেশগুলোর নাগরিক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মানসিক রোগীকে ভালো করার জন্য সাইকোথেরাপির বিকল্প নেই। সাইকোথেরাপি প্রয়োগ করা হলে রোগীর শতভাগ সুস্থতা আশা করা যায়।

সালমা আফরোজ (৩৬) রাজধানীর মীরপুরের বাসিন্দা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নিয়মিত কাউন্সেলিং নিচ্ছেন। আলাপে জানা গেলো— সালমা একটুতেই ভয় পান। লিফটে উঠতে,ভিড়ের মধ্যে যেতে, কিংবা জ্যেষ্ঠ কোনও ব্যক্তিকে দেখামাত্র তার মধ্যে অস্বস্তি ও ভয় কাজ করে। এই সমস্যা একমাত্র সালমা আফরোজের নয়, তার মতো বহুরোগী জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, ডিপার্টমেন্ট অব কাউন্সেলিং সাইকোলজি এবং বিএসএমএমইউ-তে কাউন্সেলিং থেরাপি নেন। বিএসএমএমইউ-তে এই থেরাপির জন্য রেজিস্ট্রেশন করা হয় প্রতি সোমবার।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, দেশে এই মুহূর্তে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে। তাদের দাবি, দেশে বর্তমানে ৫০০ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দরকার। আগামী ২০ বছরে দরকার আরও এক হাজার জন। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৩০০ জন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ আছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
চিকিৎসকরা মনে করেন, মানসিক রোগ আগেও ছিল। আগে মানুষ এতটা সচেতন ছিল না, ফলে এগুলো যে মানসিক সমস্যা, তারা তা বুঝতো না,জানতো না। এছাড়া, জীবনে যত জটিলতা বাড়ে, সামাজিক অস্থিরতা যত বাড়ে— প্রযুক্তির আধুনিকায়নের কারণে এগুলো আমাদেরকে চাপের মধ্যে রাখে। এসব কারণে আমাদের মানসিক সমস্যা বাড়ছে।

মানসিক রোগে আক্রান্ত সবার জন্য— তবে কারও কারও জন্য সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন হয় উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং দিই এজন্য যে, ওষুধ দিয়ে সবকিছু পরিবর্তন করা যায় না। মনের গভীরে এমন কিছু চিন্তা-বিশ্বাস বা দৃষ্টিভঙ্গি, চরিত্র বা স্বভাবে আছে যেগুলো বদলাতে হলে, এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে তাদের চিন্তা-মনন, মেজাজ,ব্যক্তিত্ব— মোদ্দা কথা তাদের অনেক কিছুই বদলে দিয়ে পরিবর্তন আনা হয়। এই যে পরিবর্তন, এটা আনতে গেলেই সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং লাগে। অর্থাৎ মানসিক রোগীদের আচরণগত অনেক সমস্যা আছে, মানসিক সমস্যা আছে। তাদের আচরণগত মন, আবেগ, চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হলে সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণত চিকিৎসক রোগীকে দেখবেন এবং সিদ্ধান্ত নেবেন। কাকে ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করবেন, কাকে সাইকোথেরাপি দেবেন এবং কারও কারও ক্ষেত্রে ওষুধ ও সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং এর প্রয়োজন হয়।’
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. হেলাল উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কাউন্সেলিং হচ্ছে মানসিক চিকিৎসা সেবার একটি অংশ। যাদের মানসিক অসুস্থতা আছে, তাদের কারও কারও তবে সবার নয়, মানসিক অসুস্থতার জন্য বেশিরভাগেরই ওষুধ লাগে। কারও কারও ওষুধের পাশাপাশি কাউন্সেলিংও লাগে। বিশেষ করে বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা বা এনজাইটি। এছাড়া, শিশুদের ক্ষেত্রেও কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন আছে। সম্পর্কের জটিলতায় কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন আছে। তবে,ওষুধের পাশাপাশি সাধারণত কাউন্সেলিং বেশি ফলদায়ক হয়।’
ডা. হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘কাউন্সেলিং সাইকোথেরাপির একটা অংশ। কাউন্সেলিংয়ের জন্য সাইকোলজিস্ট, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টরা এই কাজটি করে থাকেন।’
বিএসএমএমইউ এর সাবেক অধ্যাপক ডা. এম এ সালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাইকোথেরাপির মধ্যে কাউন্সেলিং একটি। সাইকোথেরাপির মধ্যে আছে— বিহেভিয়ার থেরাপি, কাউন্সেলিং। এক একটা রোগের জন্য একেকটা দিতে হয়। কিছু রোগের জন্য কাউন্সেলিং বা বিহেভিয়ার থেরাপি প্রয়োজন হয়, যেমন— এনজাইটি, ডিজঅর্ডার কিংবা ফোবিয়া বা ভয়। অপসেসন কমপালসিভ ডিজঅর্ডার এগুলোর ক্ষেত্রে বিহেভিয়ার থেরাপি লাগে। আবার ব্রেকিং রিলেশনশিপ— সেসব ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং লাগে। ওষুধের পাশাপাশি কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি বা বিহেভিয়ার থেরাপি লাগে। এটা সাইকিয়াট্রিস্ট ছাড়া অন্যরা বোঝেন না। রোগীর কী লাগবে এটা ঠিকভাবে বুঝতে পারেন কেবল একজন মনোরোগ চিকিৎসক।’

তিনি বলেন, ‘ধরুন, কারও যদি ফোবিক এনজাইটি ডিজঅর্ডার হয়, কিংবা সঙ্গে যদি প্যানিক অ্যাটাক থাকে, তাহলে তার কিছু ওষুধ লাগবে। ওষুধের পাশাপাশি তার বিহেভিয়ার থেরাপি লাগবে। সাধারণত এই রোগটা নির্ণয় করবেন মনোরোগ চিকিৎসক। এর ওষুধও দেবেন তিনিই। দেখা যাচ্ছে, ওষুধে একজন রোগীর ৫০ থেকে ৮০ ভাগ রোগ ভালো হয়ে যায়। কিন্তু হান্ড্রেড পার্সেন্ট ভালো হতে লাগবে সাইকোথেরাপি।’

-বাংলা ট্রিবিউন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •