cbn

সিবিএন ডেস্ক:
গত বছর ডিসেম্বরে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট আসিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে ধাপে ধাপে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে। তবে শুক্রবার থাইল্যান্ডে শেষ হওয়া আসিয়ানের দুইদিনের বৈঠক থেকে প্রত্যাবাসন নিয়ে সুস্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। বৈঠক থেকে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকটের নেপথ্য কারণ উদঘাটন করে বাস্তুচ্যুতদের ফিরিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। জানানো হয়েছে, প্রত্যাবাসন উদ্যোগে সহায়তা দিতে আসিয়ানের যে প্রতিনিধি দলের রাখাইনে যাওয়ার কথা ছিল, ‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতি’র অবসান না হলে তারা সেখানে যাবেন না। ঠিক করে নাগাদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে, তার দিনক্ষণও জানাতে পারেনি তারা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা।

১‌৭ ও ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে আসিয়ানের পক্ষ থেকে বলা হয়, মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং তার সমাধানে সহযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা, যাতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। আসিয়ানের বর্তমান সভাপতি রাষ্ট্র থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডন প্রামুদিনি সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে আসিয়ান জাতিসংঘের কাছে সহযোগী হওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছি সংস্থাটি।

২০১৮ সালের নভেম্বরে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আসিয়ান সম্মেলনের আলোচনায় প্রাধান্য পায় রোহিঙ্গা সংকট। ডিসেম্বরে মিয়ানমার সফরে যান আসিয়ানের মহাসচিব। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ‘নিডস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট টিম’ নামে একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর ব্যাপারে নেপিদোর সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়। সে সময় সু চি সরকারের সমাজ কল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইউ উইন মিয়াত আইমিয়ানমার টাইমসকে জানিয়েছিলেন, আসিয়ানের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ৭ লাখেরও বেশি শরণার্থী প্রত্যাবর্তন পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবে।

কথা ছিল ১২ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি আসিয়ানের ওই টিম রাখাইনে থেকে সেখানকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে। তবে সেখানার অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কারণ দেখিয়ে সেই সফর স্থগিত রাখা হয়েছে। সম্মেলনে থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কেবল তখনই ওই কাজ শুরু করা সম্ভব, যখন রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করবে। প্রত্যাবাসনের জন্য নির্দিষ্ট কোনও সময়সীমা নাই বলে স্বীকার করেছেন তিনি। আসিয়ানের ‘মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র-এএইচএ’ থেকে রাখাইনে প্রতিনিধি দল পাঠানোর ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। ডন প্রামুদিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘এএইচএ মিয়ানমার সরকারকে তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করবে। আমাদের আশা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সম্ভব হবে।

ডন প্রামুদিনি বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও রাখাইনবাসীর কল্যাণে প্রত্যেক আসিয়ান দেশ তাদের নিজেদের মতো করে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। রাখাইনকে প্রত্যাবাসনে প্রস্তুত করার পাশাপাশি সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বার্থে বেশকিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে তারা। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্কুল প্রতিষ্ঠা ও চালের মিল স্থাপনসহ কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের কথা ভাবছে আসিয়ানের সদস্য দেশগুলো।
কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার। মিয়ানমারের অধিবাসী হলেও রোহিঙ্গাদেরকে বেশিরভাগ রাখাইন বৌদ্ধ বাংলাদেশ থেকে সেখানে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী বিবেচনা করে। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। বিদ্বেষী প্রচারণার মধ্য দিয়ে রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেখানকার রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ ঘৃণার চাষাবাদ করেছে দীর্ঘদিন। বিদ্বেষের শেকড় তাই দিনকে দিন আরও শক্ত হয়েছে।

৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের কাগজ তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের হাতে। রং-বেরঙের এইসব পরিচয়পত্রে ধাপে ধাপে আরও মলিন হয়েছে তাদের পরিচয়। ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, সেনা নিধনযজ্ঞের শিকার হয়ে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর বৌদ্ধ পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে রাখাইনকে রোহিঙ্গা শূন্য করা হচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •