ডেস্ক নিউজ:
রাখাইনে জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডির সফর স্থগিত করেছে মিয়ানমার। সম্প্রতি রাখাইনে নিরাপত্তা রক্ষী ও জাতিগত আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে সংঘর্ষের পর গত সপ্তাহে তার ওই সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের এক মুখপাত্র সোমবার বলেছেন, পূর্বপরিকল্পিত ওই সফর স্থগিত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাখাইনেই ২০১৭ সালে সেনাবাহিনী নৃশংসতা চালায় মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের কমপক্ষে ৭ লাখ ২০ হাজার পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু শান্ত হয়নি রাখাইন। সেখানে সম্প্রতি নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারী ও বৌদ্ধ আরাকান আর্মির মধ্যে।

আরাকান আর্মি হলো রাখাইনের জাতিগত একটি সশস্ত্র বৌদ্ধ গ্রুপ। তারা রাখাইনে বসবাসকারী বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছে। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে পুলিশের পোস্টে গত ৪ জানুয়ারি তারা হামলা চালায়। এতে নিহত হন মিয়ানমারের ১৩ পুলিশ। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র আন্দ্রেজ মাহেসিক বলেছেন, মিয়ানমার সরকারের দেয়া রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ফিলিপ্পোর ওই সফর স্থগিত করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রমতে, মিয়ানমারের সর্বশেষ পরিস্থিতি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ সপ্তাহের শেষের দিকে তোলার কথা ব্রিটেনের। ফিলিপ্পো গ্রান্ডির সফর বিলম্বিত করা ও জাতিসঙ্ঘের দূত ক্রিস্টিন শ্রানার বার্গেনাররের আলাদা সফর অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়ে গেছে। মনে করা হচ্ছে এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্কটের বিষয়টি থেকে পূর্ব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে মিয়ানমার। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের একজন কূটনীতিক বলেন, মিয়ানমার চায় না সেখানকার কোনো ঘটনা বা কোনো ঘটনার বিন্দুমাত্র উন্মোচিত হোক।

জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, গত মাসে রাজ্যটিতে দেশটির সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির লড়াইয়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
মূলত আরাকান আর্মির বেশির ভাগ সদস্যই এসেছেন নৃতাত্ত্বিক বৌদ্ধ গোষ্ঠীগুলো থেকে। সাম্প্রতিক এসব সহিংসতায় রাখাইনে মারাত্মক নৃতাত্ত্বিক বিভাজন আরো স্পষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়টি রাজ্যটিতে দীর্ঘ দিন ধরে বড় ধরনের ক্ষতের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় সাহায্যকর্মীরা দাবি করছেন, জানুয়ারির প্রথম দিকে রাখাইনে সামরিক বিমান ও ট্রাক আসতে দেখা গিয়েছিল। সামরিক বাহিনীর ওই প্রস্তুতিতে মনে হচ্ছে রাজ্যটিতে সহিংসতা আবারো মারাত্মক রূপ নিতে যাচ্ছে।

বৈষম্যের অভিযোগ
অনলাইনে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বিদ্রোহী নারী-পুরুষরা কুচকাওয়াজ করছে। এর পাশাপাশি তারা মুষ্টিযুদ্ধ করছেন, স্নাইপার রাইফেলসহ বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়ছেন। ভিডিওতে গ্রুপটির আধ্যাত্মিক নেতা তিওয়ান এমরাট নেইয়াংকেও দেখানো হয়।

আরাকান আর্মির সে প্রচারণায় তারা অর্থনৈতিক শোষণ ও ঐতিহাসিক অবিচারের বিবরণ দিয়েছে। এগুলোর জন্য তারা অভিযুক্ত করেছে মিয়ানমার রাষ্ট্র ও তার নৃতাত্ত্বিক সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোর দিকে। তেলসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর হলেও রাখাইন মিয়ানমারের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য। ২০১৭ সালের বিশ্বব্যাংক জরিপে বলা হয়, রাজ্যটির মাত্র ১৭ শতাংশ লোক নিরাপদ পানি পান করতে পারে। আর তিন লাখ বাড়িতে কোনো টয়লেটই নেই। ঐতিহাসিকভাবে আরাকান ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য। ১৮ শতকে বার্মিজরা হামলা চালিয়ে তা দখল করে নেয়।

অনিশ্চিত আগামী
গত কয়েক বছরে সামরিক বাহিনীর সাথে বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষে জড়িয়েছিল আরাকান আর্মি। কিন্তু গত কয়েক মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে অন্তত দুই ডজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। রাখাইনে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক হামলা ঠেকাতেই তারা এসব সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে বলে জানায় আরাকান আর্মি। দলটির প্রধান তিওয়ান এমরাট নেইয়াং চলতি সপ্তাহে স্থানীয় গণমাধ্যম ইরাবতিকে বলেন, রাখাইনে অবশ্যই নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকতে হবে। এখানে সশস্ত্র একটি বাহিনী থাকলে রাখাইনের জাতিগত পরিচয় অক্ষুণ্ন থাকবে।

মিয়ানমার সরকার দলটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আখ্যা দিয়ে জানায়, এটি আগামী দিনগুলোতে রাজ্যটির পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কাচিন বিদ্রোহীদের কাছে প্রশিক্ষণ নেয়া আরাকান আর্মি মিয়ানমারের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাদের শঙ্কা, সুসজ্জিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিদ্রোহী এ গোষ্ঠীটি আরাকান রোহিঙ্গা স্যাল্যভেশন আর্মির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। বর্তমানের এসব সহিংসতা আগামী দিনে বড় ধরনের লড়াইয়েরই পূর্বাভাস দিচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেন। তারা আরো বলেন, ক্রমেই আরাকান আর্মির শক্তি আরো বড় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এমনকি উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় তারা তাদের যোদ্ধাদের তারা কোম্পানি ও প্লাটুন আকারে পরিচালনা করে থাকে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •