শাহীন মাহমুদ রাসেল:
বছর ঘুরছে আর বাড়ছে বাড়ি ভাড়া। বছরের পর বছর ধরে কক্সবাজার জেলায় বাড়ি ভাড়ায় নৈরাজ্য চলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ নিয়ে সরকারের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মাথা ব্যথা নেই। ভাড়াটেরা বাড়ির মালিকদের কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রায় ২০ লাক্ষ মানুষের বসবাস কক্সবাজার শহরে। তবুও জীবিকার তাগিদে এই পর্যটন নগরীকেই বেছে নিচ্ছে সবাই। তাই প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। আর বাইরে থেকে আসা মানুষের একমাত্র আশ্রয়স্থল ভাড়া বাসা। আর এ সুযোগে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বাড়ির মালিকরা ভাড়ার বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেন ভাড়াটিয়াদের কাঁধে। কক্সবাজারে ৫৭ শতাংশ বাড়ি মালিকের কাছে এই ৪৩ শতাংশ ভাড়াটিয়া জিম্মি।

এছাড়া বাড়ির ভাড়া কেমন হবে, কখন ভাড়া বাড়বে, ভাড়াটিয়াকে কখন উচ্ছেদ করা যাবে, অগ্রিম জামানত গ্রহণ, ভাড়া আদায়ের রশিদ প্রদান, লিখিত চুক্তি, বাড়ি মেরামত ও বসবাস যোগ্য কিনা- বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ধরণের আইনে তোয়াক্কা করেন না বাড়ির মালিকরা। অন্যদিকে, বেশির ভাগ ভাড়াটিয়া বিষয়গুলো না জানায় সব অনিয়ম মুখ বুজে সহ্য করেন। একটি সূত্রে জানা যায়, পৌরসভা কর্তৃক নির্ধারিত যে টাকা রয়েছে। কিন্তু বাড়ির মালিকরা ভাড়া আদায় করছেন এর দ্বিগুণ থেকে তিনগুণেরও বেশি।

পুরো পর্যটন নগরজুড়েই যেন চলছে বাড়িভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য। বাড়িওয়ালারা যখন ইচ্ছা তখন বাড়িভাড়া বাড়াচ্ছে। আর বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়িভাড়ায় নৈরাজ্য ভাড়াটিয়া জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।

প্রতি বছর জানুয়ারি এলেই ভাড়া বৃদ্ধির খড়গ নামে ভাড়াটিয়াদের উপর। আর প্রতি বছরের ন্যায় কক্সবাজারে প্রায় সব বাড়িওয়ালাই ইতোমধ্যে চলতি জানুয়ারি থেকে ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ দিয়েছেন ভাড়াটিয়াদের। এ বৃদ্ধির পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে জানিয়েছেন ভাড়াটিয়ারা।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের পর কক্সবাজার শহর ও পর্যটন এলাকায় অবস্থানভেদে ভাড়ার হারও নির্ধারণ করে। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সেই হার পুনর্নির্ধারণ করে বাস্তবায়নের জন্য সরকারের বিভিন্ন দফতরে দিয়েছি। আইনটি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কেউই তা আমলে নিচ্ছে না। এ সুযোগে বাড়িওয়ালারা ইচ্ছা মত ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে।

সুত্র মতে, কক্সবাজার শহরে ৪৩ শতাংশ মানুষ ভাড়া থাকে। অথচ বেশির ভাগ বাড়িওয়ালাই ভাড়ার রশিদ দেন না। চুক্তি করেন না। কোন বাড়ির মালিক চুক্তি করলেও সব শর্ত থাকে নিজের পক্ষে। জোর করে ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ, ইচ্ছা মতো ভাড়া বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো সবার চোখের সামনে হচ্ছে। কিন্তু দেখার কেউ নাই। বাড়ি ভাড়া এখন লাভজনক বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা নিরসনে সরকার পদক্ষেপ না নিলে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার বিরোধ বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নেবে।

কালুর দোকান এর বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, আমি এখন যে বাসায় আছি সেখানে তিন বছরে ভাড়া বেড়েছে ৫ হাজার টাকা। ১২ হাজার টাকা ভাড়ায় উঠেছি। এখন দিতে হচ্ছে ১৭ হাজার টাকা। এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে গেলে বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দিতে বলে।

টেকপাড়ার নিয়ামুল ইসলাম নামের আরেক ভাড়াটিয়া বলেন, জানুয়ারি হচ্ছে ভাড়া বৃদ্ধির মাস। প্রতি বছর বাড়ি ভাড়ার সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিও নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের ভাড়াটিয়া হিসেবে টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে। এই ধরনের অভিযোগ শত শত ভাড়াটিয়ার। এমনও অভিযোগ আছে নানা অজুহাত দেখিয়ে পুরাতন ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বেশি টাকা দিয়ে নতুন ভাড়াটিয়া নিচ্ছে।

শুধু শহরে নয় উখিয়া-টেকনাফের চিত্র আরো ভয়াভহ। ওখানে সুবিধাবাদি লোকজন ঘর ভাড়াকে বড় বানিজ্য হিসেবে নিয়েছে। এমনও খবর আছে গরুর গোয়াল ঘর পর্যন্ত একটু পরিচর্যা ভাড়া বাসা তৈরী করে ভাড়া দিচ্ছে। ওই এলাকায় যে বাসা ৫০০ টাকায় ভাড়া দিত সেই বাসা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে ৫ হাজার টাকায়।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার সেবা প্রদানে কাজ করছে দেশি-বিদেশী এনজিও সহ আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকজন। একদিকে রোহিঙ্গা অন্যদিকে তাদের সেবা প্রদানে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের কারনে শহরে বেড়েছে ভাড়া বাসার চাপ। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে বাড়ির মালিকেরা। তারা ইচ্ছেমত বাড়ি ভাড়া বাড়াচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, যতই বাড়ি ভাড়া ভাড়া করা কেন কোন বাসা খালি যাচ্ছেনা। রীতিমত অগ্রিম বুকিং হয়ে যাচ্ছে। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু বাড়িওয়ালা কোন কিছু তোয়াক্কা না করে যাচ্ছে তাই বাড়ি ভাড়া বাড়াচ্ছে। এতে ভোগান্তির শেষ থাকছেনা সাধারণ ভাড়াটিয়াদের।

সরকার ১৯৯১ সালে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করে। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক ও উপ-নিয়ন্ত্রক নিয়োগেরও বিধান রাখা হয়েছে আইনে। আইনটি প্রণয়নের পর কক্সবাজারেরর বিভিন্ন এলাকা ও অবস্থানভেদে ভাড়ার হারও নির্ধারণ করে। কিন্তু পরে এসব কিছুই আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৬ বছর আগে আইন করা হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়নি কোনোদিন। বাড়িভাড়া নিয়ে বিরোধের কারণ চিহ্নিত করতে ২০১৫ সালের ১ জুলাই উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। ছয়মাসের মধ্যে এই কমিশন গঠন করতে বলে উচ্চ আদালত। কিন্তু এ বিষয়েও সরকারের কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

এই অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তেমন কোন আইন প্রয়োগ না থাকায় হতাশ সচেতন মহল। তারা বলছে এই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত আইন প্রয়োগ জরুরী হয়ে পড়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •