ডেস্ক নিউজ:
টানা তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে জনমনে যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সেটি বিবেচনায় নিয়েই এবার মন্ত্রিসভা গড়বেন নবনির্বাচিত সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস মিলেছে। ওই নেতারা বলেছেন, উন্নয়ন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবে নতুন মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেও কাজ করবে। আর ওই সব কাজের জন্য তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির অধিকারী নেতারা অগ্রাধিকার পাবেন নতুন মন্ত্রিসভায়।

আগামীকাল সোমবার বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা জানান, সংসদ নেতা শেখ হাসিনা এবার সব দিক বিবেচনা করে মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। বিবেচনা পাবে অনগ্রসর এলাকাগুলো। নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি তরুণদের অভিমতকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিরামহীনভাবে কাজ করতে পারেন—এমন ব্যক্তিদের স্থান হতে পারে নতুন মন্ত্রিসভায়। আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুশাসনের অঙ্গীকার করেছেন। সে ক্ষেত্রে বর্তমান মন্ত্রিসভায় সৎ ও নির্লোভ হিসেবে যাঁরা পরিচিত, তাঁদের রেখে নতুন মুখ অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সেই বিবেচনায় বর্তমান কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের মতো ব্যক্তিরা ইতিবাচক অবস্থানে আছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় বিপুল বিজয় তো বিপুল প্রত্যাশা। বিশাল বিজয়ের সঙ্গে বিশাল প্রত্যাশা। জনগণেরও এখানে একটা প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি তো একজনই (শেখ হাসিনা) করতে পারেন।’ তিনি জানান, মন্ত্রিসভায় বিশাল চমক থাকতে পারে বলে তাঁর মনে হয়েছে। তবে বিষয়টা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখতিয়ার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত (বর্তমান) মন্ত্রিসভায় অনেক সমস্যা ছিল। এবার নতুন মন্ত্রিসভায় যেন তা না হয়। ব্ল্যাক স্পট আছে এমন ব্যক্তিরা যাতে না আসতে পারে সেটা দেখতে হবে।’ তিনি বলেন, উন্নয়নের জন্য বড় মন্ত্রিসভার প্রয়োজন নেই। ৩০ থেকে ৩৫ জন সদস্য হলেই হয়।

এবার কেমন হচ্ছে নতুন মন্ত্রিসভা, বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে কারা থাকছেন, কে কে বাদ পড়ছেন সে নিয়ে আলোচনা এখন ঘরে-বাইরে, অফিসে, রেস্তোরাঁয়। সবার চোখ এখন সম্ভাব্য মন্ত্রিসভার দিকে।

জানা গেছে, দশম জাতীয় সংসদের সদস্যদের মতোই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদেরও ‘আমলনামা’ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে। গত পাঁচ বছরে কার কী সফলতা, ব্যর্থতা, দক্ষতা, অদক্ষতা সব বিষয়েই পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও ধারণা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। তিনি গত পাঁচ বছরে প্রতিটি মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে প্রত্যক্ষ করেছেন খুঁটিনাটি বিষয়। মন্ত্রিসভায় ছয় মাস অন্তর সব মন্ত্রণালয়ের কাজের মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা।

মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির প্রধান এইচ এম এরশাদ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা বিরোধী দলে থাকবেন। জাতীয় পার্টি থেকে কেউ মন্ত্রী হচ্ছেন না। এইচ এম এরশাদ হবেন বিরোধী দলের নেতা। উপনেতা হবেন জাপার কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং বিরোধী দলের চিফ হুইপ হবেন মসিউর রহমান রাঙ্গা। রওশন এরশাদের অনুসারীরা অবশ্য দশম সংসদের মতো বিরোধী দলে থেকেও মন্ত্রিত্ব করতে চান। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টির সরকারে থাকা না থাকার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ও মহাজোটের নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর নির্ভর করছে।

শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় জাপা না থাকলে ১৪ দলের শরিকদের কপাল খুলতে পারে। শরিক দুই দল জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির দুই প্রধান নেতা হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেনন বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য। নতুন মন্ত্রিসভায়ও তাঁরা থাকছেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক। কিন্তু দল দুটির মধ্য থেকেই একাধিক নেতা মন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে চেয়ে আছেন। ১৪ দলের শরিক অন্য দলগুলোও চায় তাদের মধ্য থেকে মন্ত্রী করা হোক।

মন্ত্রিত্বের দাবিতে স্লোগান উঠেছে আওয়ামী লীগে। গত শুক্রবার পটুয়াখালী, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার, পিরোজপুর, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা, নাটোর, নেত্রকোনা, রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইলে মন্ত্রিত্বের দাবিতে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বিষয়টি আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে বলে জানা গেছে।

শেখ হাসিনা সুশাসনের পাশাপাশি মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছেন। ওই নীতির কারণেই কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি দলীয় মনোনয়ন পাননি। ধারণা করা হচ্ছে, মন্ত্রিসভায়ও এর প্রতিফলন দেখা যাবে। সমালোচনা হতে পারে—এমন ব্যক্তিদের ঠাঁই হবে না মন্ত্রিসভায়। এই তালিকায় আছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকট কামরুল ইসলাম প্রমুখ।

আওয়ামী লীগের নতুন সরকারের এই মেয়াদেই পালিত হবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অর্থাৎ ৫০ বছর পূর্তি এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উৎসব। এই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য থাকবে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়ন শুরু করা। এসবের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সফলভাবে মোকাবেলার চেষ্টাও থাকবে নতুন সরকারের। এসব চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের উপযোগী মন্ত্রিসভা গঠন করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •