ইমাম খাইর, সিবিএন:
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সবাইকে দেশপ্রেমের অগ্নিমন্ত্রের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, একাত্তরের স্বপ্নের সোনার বাংলা দেখতে চাইলে ১৬ ডিসেম্বরের চেতনা থেকে প্রেরণা নিতে হবে। আত্নত্যাগের বহ্নিশিখায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অসাম্প্রদায়িক ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে একসাথে কাজ করবো, এই হোক মহান বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।
১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে কক্সবাজার বীরশ্রেষ্ট রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে জেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনীতে জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে বিজয় দিবসের কর্মসূচির শুভ সূচনা করেন তিনি।
বিজয় দিবসের সভায় জেলা প্রশাসক বলেছেন, ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, সুখি-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ গড়তে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। এই দেশ আমার, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের।
জেলা প্রশাসক আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শীতা ও সৃষ্টিশীল চেতনায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বে টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের রোল মডেল। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৬৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ১৭৫১ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশশ ব্যাংকের রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শিক্ষার হার ৭২.৯ শতাংশ। গড় আয়ু ৭২ বছর এবং সামাজিক সকল সূচকে এশিয়ার সব দেশকে পেছনে ফেলেছে আমার বাংলাদেশ। এই মুহুর্তে পেছনে তাকানোর সময়-সুযোগ নেই। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সময়। ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে এগিয়ে যেতে হবে।
বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের কক্সবাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, কক্সবাজারকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনশিল্প বিকাশে নেয়া হয়েছে ২৬টি মেগা প্রকল্প। কক্সবাজারে ৭টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল, তেল পরিবহনের এসপিএম কর্তৃক পাইপলাইন নির্মাণ, আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর স্থাপন, চট্টগ্রামের দোহাজারি থেকে রামু হয়ে বান্দরবানের ঘুমধুম পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, মুক্তিযুদ্ধে কক্সবাজারের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ, দীর্ঘ এবং মহিমান্বিত। এই মহান দিনে জেলা সকল স্তরের মুক্তিযোদ্ধার প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ ও অভিবাদন। আপনাদের সাহসিকতা আর দেশপ্রেমের ফসল আজকের এই বিজয়। আমি কক্সবাজারবাসীকে মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানাই।
এ সময় পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহিদুর রহমানসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ফিরে দেখা ১৬ ডিসেম্বর:
১৬ ডিসেম্বর গৌরবোজ্জ্বল দীপ্ত বিজয়ের দিন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের দিন। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, নিপীড়ন আর দুঃশাসনের জাল ভেদ করে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিজয়ের প্রভাতী সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে উঠেছিল বাংলাদেশের শিশির ভেজা মাটি। অবসান হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাড়ে তেইশ বছরের নির্বিচার শোষণ, বঞ্চনা আর নির্যাতনের কালো অধ্যায়।
প্রায় ৯২ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের ঐতিহাসিক রোসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল এই মহেন্দ্রক্ষণ। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করে এইদিনই বীর বাঙালি জাতি ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজের পতাকা। পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর লাখো প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের আজকের দিনে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখিয়ে পাকিস্তানিরা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার জন্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভকারী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে টালবাহানা শুরু করে শাসক গোষ্ঠী। ফলে ক্ষোভে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। একাত্তরের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ জনগণের স্বাধীনতার স্পৃহাকে প্রবল করে তোলে। ঢাকা যখন অগ্নিগর্ভ, তখন পাকিস্তানি শাসকচক্র আমাদের মুক্তির স্পৃহাকে দমনের পথ বেছে নেয়। রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার মাধ্যমে জন্ম দিল ২৫ মার্চের কালরাত্রি। এরপরই চূড়ান্ত হয়ে যায় আমাদের পৃথক পথচলার যাত্রা। ওদের সাথে আর নয়। ২৬ মার্চ থেকে শুরু হল চূড়ান্ত লড়াই। দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিসংগ্রামের পর পরাজয় মেনে নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়াদী উদ্যান) ৯১ হাজার ৪৯৮ জন নিয়মিত অনিয়মিত এবং আধা সামরিক সৈন্য নিয়ে ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পণ করেন সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিত সিং অরোরা’র কাছে। শুরু হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পথচলা।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •