|| মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী ||

ক্ষমতাসীন মহাজোটের অংশীদার এরশাদের জাতীয় পার্টি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সহ দেশের প্রধান বিরোধীদলগুলো অংশ না নেয়ার সুযোগে আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি সহ আরো কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সাথে আসন ভাগাভাগি করেছিল। সে ভাগাভাগিতে কক্সবাজার-১ আসনটি জাতীয় পার্টি ভাগিয়ে নিয়ে সেখানে বর্তমান এমপি মৌলাভী মোহাম্মদ ইলিয়াছ বিনাপ্রতিদ্বন্ধিতায় (বিকাশ!) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে সংরক্ষিত নারী আসনে কক্সবাজারের নারীনেত্রী, জাপা’র কেন্দ্রীয় নেত্রী খোরশেদ আরা হক’কে মনোনয়ন দিয়ে এমপি বানানো হয়। অর্থাৎ দশম জাতীয় সংসদে কক্সবাজারে জাতীয় পার্টির দু’জন এমপি ছিল।

কক্সবাজার-১ আসনে বিকাশে(!) এমপি মৌলভী মোহাম্মাদ ইলিয়াছ সংসদ সদস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক পদের অধিকারী হওয়ায় জাপা ও আওয়ামীলীগের স্থানীয় অনেক নেতাই আফসোস করেছিলেন-তখনকার সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বেলায়ও দশম জাতীয় সংসদের মতো হয়ত বিএনপি নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে-তাই এ সুযোগকে সময়মত কাজে লাগাতে কক্সবাজারের চারটি আসনে জাপার বেশ ক’জন নেতা গত কয়েকবছর ধরেই নির্বাচনী মাঠে থাকার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা এবার মহাজোটের নমিনেশন পাওয়ার অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু তাদের সকলে অর্থাৎ কক্সবাজার-১ আসনে মৌলভী মোহাম্মদ ইলিয়াছ, কক্সবাজার-২ আসনে মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ, কক্সবাজার-৩ আসনে মফিজুর রহমান, কক্সবাজার-৪ আসনে মাস্টার এম.এ মন্ঞ্জুর জাতীয় পার্টির মনোননয় নিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কক্সবাজার-২ আসনের জাপা প্রার্থী মোহাম্মদ মুহিবুল্লাহ’র মনোনয়নপত্রটি আয়কর সংক্রান্ত জটিলতায় বাছাইতেই বাতিল হয়ে যায়। ৮ ডিসেম্বর শনিবার মহাজোট তিনশ’ আসনে তাদের চুড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষনা করেছে। সেই তালিকায় কক্সবাজারের চারটি আসনে যে চারজন আওয়ামীলীগের প্রার্থী দেয়া হয়েছিল, সেই চারজনকেই ঘোষিত চুড়ান্ত তালিকায় মহাজোটের প্রার্থী হিসাবে বহাল রেখেছে। তাঁরা হলেন-কক্সবাজার-১ আসনে জাফর আলম, কক্সবাজার-২ আসনে আশেক উল্লাহ রফিক, কক্সবাজার-৩ আসনে সাইমুম সরওয়ার কমল ও কক্সবাজার-৪ আসনে শাহিন আক্তার। এখন প্রশ্ন উঠেছে- জাতীয় পার্টির চার জন প্রার্থী কেন জেনেশুনে জাপা’র মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন? তাঁরা কি নিজেদের দল শুধুমাত্র জাপা’র মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করলে নির্বাচিত হবেন অথবা নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারার মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন? একাধিক মাঠ জরীপের তথ্য অনুযায়ী তাঁদের কেউই তৃনমূলে শুধুমাত্র জাতীয় পার্টির হয়ে নির্বাচনী লড়াই করার মতো রাজনৈতিক অবস্থান তাঁরা সৃষ্টি করতে পারেননি। তাহলে কি তাঁরা সত্যি সত্যি ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি একতরফা অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো কোন বিকাশ(!) হওয়ার সুযোগ আসলে সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন? নাকি আওয়ামীলীগের সাথে দরকষাকষি করে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত একটি আসন হলেও জাপা’র প্রার্থীর জন্য ছিনিয়ে আনার জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন?

এ প্রসংগে কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেছেন, এবারের নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তাই এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের কক্সবাজার জেলার কোন আসনে মনোনয়ন নাদিয়ে দলের হাইকমান্ড খুব ভাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে। কারণ কক্সবাজারের কোথাও জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট রনজিত দাশ বলেছেন, যদি কক্সবাজারের কোন আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে মহাজোটের মনোনয়ন দেয়া হতো-সে আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই আসনটা হাতছাড়া হয়ে যেতো। কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন বলেছেন-এটা গণমানুষের নির্বাচন। যাঁদের তৃনমূল পর্যায়ে গণভিত্তি রয়েছে, যাঁরা নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাতা গড়ে তুলে নির্বাচিত হতে পারবেন-মহাজোট কক্সবাজারে তাঁদেরকেই নৌকার মাঝি বানিয়েছেন। কক্সবাজার জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোহাম্মদ তারেক বলেছেন-তৃনমূলের গ্রহনযোগ্যতা যাচাই নাকরেই কক্সবাজারে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম হলে সংগঠন চরম অস্বিত্ব সংকটে পড়বে বলে এডভোকেট মোহাম্মদ তারেক আশংকা পোষন করেছেন। জাতীয় পার্টির কক্সবাজার জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক জমিদার রুহুল আমিন সিকদার বলেছেন-আমরা মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরীক সংগঠন হয়েও কক্সবাজারে আমাদের দলকে কোন মূল্যায়ন করেনি, এটা খুবই দুঃখজনক। কক্সবাজার জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার-৩ আসনে জাপা’র মনোনয়নপত্র দাখিলকারী মফিজুর রহমান বলেছেন-বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটি রাজনৈতিক সংগঠন রয়েছে বলে হচ্ছে। একটি হচ্ছে আওয়ামীলীগ, আরেকটি মনে হয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। জাতীয় পার্টিকে শেখ হাসিনা সহ সিনিয়র আওয়ামীলীগ নেতারাই পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। মফিজুর রহমান হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন-জিয়াউদ্দিন বাবলুই তাঁর কপাল পুড়েছেন। তবে মফিজুর রহমান মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার নাকরে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়ছেন। কক্সবাজার-৪ আসনে জাপা’র মনোনয়ন দাখিলকারী মাষ্টার এম.এম মন্ঞ্জুর অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছেন-আমাকে কেউ এখনো পর্যন্ত মনোনয়নপত্রটা প্রত্যাহার করতেও বলেনি। তাই তিনি নির্বাচন করবেন বলে জানান। জাপা’র কক্সবাজার জেলা সভাপতি ও কক্সবাজার-১ আসনে জাপা’র মনোনয়নপত্র দাখিলকারী মৌলভী মোহাম্মদ ইলিয়াছ থেকে এবিষয়ে জানার জন্য ০১৭১২১৩৭৪৭৫ নম্বর মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে জাপা’র মনোনয়ন দাখিলকারীদের বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন-যেমন দলের শীর্ষ নেতা ভেল্কিবাজ, তেমনি মাঠপর্যায়ের নেতৃবৃন্দও একইধরনের রাজনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কক্সবাজারে জাপা নেতৃবৃন্দের এধরনের কর্মকান্ডে দলটি এখন মানুষের হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে জাপা’র মনোনয়নপত্র দাখিলকারীদের বিষয়ে সবার প্রশ্ন হলো তাঁরা কেন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •