সোয়েব সাঈদ, রামু:

রামু উপজেলার দূর্গম এলাকা ঈদগড় ইউনিয়নের পূর্ব রাজঘাটা গ্রামের গৃহবধু রোজিনা আকতার। তার বাড়ির ছায়াশীতল উঠোনে বসে আছেন শতাধিক নারী। উগ্রবাদ-সহিংসতা রোধের উপায় নিয়ে সেখানে বক্তব্য রাখছিলেন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নোঙর এর কয়েকজন কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

গৃহবধু রোজিনা আকতার জানান, একসময় গ্রামের অনেকে উগ্রবাদ-সহিংসতায় জড়িত ছিলো। গ্রাম, পাড়া-মহল্লা বা পরিবারও এ আওতামুক্ত ছিলো না। অতীতে উগ্রবাদ, সহিংসতা বা সামাজিক অপরাধ রোধেও ছিলো না কারো উদ্যোগ। এ গ্রামে কয়েক বছর ধরে নোঙর এর উগ্রবাদ-সহিংসতা বিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর ফলে উগ্রবাদ-সহিংসতা প্রতিরোধে এখন গ্রামের মানুষই ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি (১৫ নভেম্বর) নোঙর এর উদ্যোগে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী এ অনুষ্ঠানের।

একই দৃশ্য দেখা গেছে, রামুর গর্জনিয়া ইউয়িনের মাঝিরকাটা আবু তাহেরের বাড়ির আঙিনায়। গৃহকর্তা আবু তাহের জানান, সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে উগ্রবাদ-সহিংসতা থেকে মানুষকে মুক্ত হতে হবে। সমাজে যাতে কেউ অপরাধ কর্মকান্ড বা শান্তি শৃংখলা বিনষ্ট করতে না পারে সেজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা নোঙর বিগত ২ বছর ধরে এলাকায় বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করে আসছে। যার অংশ হিসেবে তাঁর গৃহাঙ্গনে স্থানীয়দের নিয়ে সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করা হয়েছে। গ্রামবাসীও এ উদ্যোগে সানন্দে সাড়া দিয়েছেন এবং সমাজে শান্তি-শৃংখলা রক্ষার শপথ নিচ্ছেন।

নোঙর এর ফিল্ড ফ্যাসিলিটিটেটর মোহাম্মদ জুবাইদ ও সাইফুল ইসলাম জানান, রামু উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় এ ধরনের সভা-সমাবেশ আয়োজন করা হয়। উগ্রবাদ-সহিংসতা নিয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সভা ছাড়াও মানববন্ধন, নারী সমাবেশ, উঠোন বৈঠক, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, পথ নাটক, কবি গান সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে উগ্রবাদ-সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ফিরে আসছে।

তারা জানান, এ প্রকল্পের আওতায় রামুর প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষিত ও বেকার যুব জনগোষ্ঠিকে জীবন দক্ষতা ও স্বাভলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরমধ্যে কম্পিউটার ও সেলাই প্রশিক্ষণ, জীবন দক্ষতা শিক্ষা, নেতৃত্ব বিকাশ ও উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, গরু মোটা-তাজাকরণ, ছাগল পালন, সবজি চাষ অন্যতম।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক বিশ^জিৎ ভৌমিক ও কর্মকর্তা হেফাজ উদ্দিন জানান, রামুর তৃণমূল জনপদে উগ্রবাদ-সহিংসতা দূর করে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নোঙর। এ লক্ষ্যে রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ২ বছর ধরে কাজ করছে সংগঠনটির একঝাঁক কর্মী। ইপসা-সিভিক কনসোর্টিয়াম এর সহযোগিতায় এবং দাতা সংস্থা জিসার্প এর অর্থায়নে রামু উপজেলায় এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সংস্থা নোঙর। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ধর্মীয় ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছেন।

নোঙর এর নির্বাহী পরিচালক দিদারুল আলম রাশেদ জানিয়েছেন, বিশে^র নানাপ্রান্তে উগ্রবাদ-সহিংস কর্মকান্ড ঘটে চলেছে। এরমধ্যে ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে সংগঠিত ধর্মীয় সহিংস ঘটনা পুরো বিশে^ সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। ‘কান নিয়েছে চিলে’ প্রবাদ বাক্যের মত একটি উড়ো বিষয় নিয়ে এখানকার মানুষ কতটা সহিংস, বিদ্বেষপূর্ণ হয়েছিলো তা ঘটনার ভয়াবহতাই বলে দেয়। অথচ কক্সবাজার জেলা শহরের চেয়ে রামু উপজেলা নানা ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত। এ ঘটনা মর্মে মর্মে উপলব্দি করে নোঙর রামু উপজেলাকে সেই সহিংস ঘটনার কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে উগ্রবাদ-সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো, সব ধরনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে উগ্রবাদ-সহিংসতা মুক্ত, শান্তি ও সম্প্রীতির রামু উপজেলা গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে খুবই সফলতার সাথে রামু উপজেলার তৃনমূল জনপদে প্রকল্পের অধিনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

রামুর উখিয়ারঘোনা সাইমুম সরওয়ার কমল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, এ প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে ওরিয়েন্টেশন ও স্বাক্ষরতা অভিযান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উগ্রবাদ-সহিংসতা রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করবে। যা সামাজিক শান্তি-সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম জানিয়েছেন, উগ্রবাদ-সহিংসতা প্রতিরোধের এ কার্যক্রম প্রশংসনীয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগেও এ ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়। এরফলে রামুর মানুষের মাঝে উগ্র ও ধর্মীয় বিভ্রান্তি যেমন দূর হচ্ছে, তেমনি মানুষ অপরাধ কর্মকান্ড থেকে মুক্ত হওয়ায় সামাজিক স্থিতিশীলতা, শান্তি-সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য তিনি প্রকল্পের সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং এ কাজ বাস্তবায়নে সার্বিক সহায়তার আশ^াস দিয়েছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •