cbn  

এম, রিদুয়ানুল হক (এম,এ)


অল্প কিছু দিন পর হতে যাচ্ছে আলোচিত-সমালোচিত একাদশ জাতীয় নির্বাচন। দশম জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন থাকলেও সরকারের উন্নয়নে তা বিলুপ্ত প্রায়ই। তারপরও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট বিহীন প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া তেমন সু-নামের হয় না। যার কারণে জনগণের কাছে তাঁদের তেমন কদর থাকে না। তাই গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার জন্য সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নাই।

আগামী ৩০ নভেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো। এর প্রেক্ষিতে সারা দেশে দলীয় মনোনয়ন পত্র সংগ্রহের মহোৎসব চলেছে। মনোনয়ন পত্র বিক্রি করে প্রত্যেক রাজনৈতিক দল অনেকটা লাভবান হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। দেশের ৩০০ আসনের বিপরীতে অনেকগুণ মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এমন কি বেশিরভাগ আসনে ২৫ থেকে ৫৫ টি পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছে আগ্রহী প্রার্থীরা। এটাকে অনেকে অসুস্থ রাজনীতি বলে আখ্যায়িত করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন এটি রাজনৈতিক কৌশল। রাজনীতিতে পজেটিভ বা নেগেটিভ থাকবে এটা স্বভাবিক। কিন্তু, তাই বলে জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য নেতারা দলীয় মনোনয়ন পত্র কিনে বসবে এটা কতটা যৌক্তিক? মেম্বার-চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রতিটি নাগরিকের নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন হলো, জাতীয় নির্বাচন করার যোগ্যতা যাদের নেই তারা কেন এটিকে তামাশায় পরিণত করছে? হ্যাঁ, জনগণের কথার সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একমত পোষণ করে বলেছেন- একটি আসনে আমার দলের এতো বেশি প্রার্থী হতে আগ্রহী কেন? হয়তঃ আপনার এলাকায় আমার দলের মধ্যে দলীয় গ্রুপিং বেশি! না হয় এভাবে মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করতেন না।

অনেক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্তমানে দলীয় মনোনয়ন পত্র যারা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা কোনো দিনন সমাজের সর্দার পর্যন্ত নির্বাচিত হতে পারবে না। তাহলে কি দলীয় মনোনয়ন পত্র তামাশায় পরিণত হয়েছে! যদি এরকম হয় তাহলে ভবিষ্যতে রাজনীতিবিদরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আমিও তাঁদের কথার সাথে সম্পূর্ণ একমত।

আসলে বর্তমানে সুষ্ঠু নির্বাচনের জ্ঞানের অভাবে এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন অনেক রাজনীতিবিদরা। এখন জেনে নি সুষ্ঠু নির্বাচন কি? ‘ দ্য স্পিরিট অব লজ ’ বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মন্টেসকিউই বলেছেন যে প্রজাতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র যে কোনো ক্ষেত্রের ভোটেই হয় দেশের প্রশাসক হও অথবা প্রশাসনের অধীনে থাকো —এই দুটি অবস্থার মধ্যেই পর্যায়ক্রমে ভোটারদের থাকতে হয়। নিজেদের দেশে কোন সরকার আসবে তা বাছাই করার ‘মালিক’বা ‘মাস্টার’ হিসেবে কাজ করে ভোটাররাই, ভোট দিয়ে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকার নির্বাচিত করা হয়।

নির্বাচন হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে জনগণ প্রশাসনিক কাজের জন্য একজন প্রতিনিধিকে বেছে নেয়। সপ্তদশ শতক থেকে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে নির্বাচন একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভার পদগুলি পূরণ করা হতে পারে, কখনও আবার কার্যনির্বাহী ও বিচারব্যবস্থা ছাড়াও আঞ্চলিক এবং স্থানীয় সরকারে প্রতিনিধি বাছাইও নির্বাচনের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়া আবার প্রয়োগ হয় বহু বেসরকারী সংস্থা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও। ক্লাব বা সমিতি থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও কর্পোরেশন বা নিগমেও এই প্রক্রিয়ার ব্যবহার করা হয়।

আধুনিক গণতন্ত্রে প্রতিনিধি বাছাইয়ের উপায় হিসেবে নির্বাচনের সার্বজনীন ব্যবহার করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের আদি চেহারা এথেন্সে নির্বাচনকে যেভাবে ব্যবহার হতো তার তুলনায় এটি অনেকটাই বিপরীত। নির্বাচনকে শাসকগোষ্ঠীর একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার বেশিরভাগ দপ্তরই পূরণ করা হতো বাছাইয়ের মাধ্যমে। এই নির্বাচন দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া বা অ্যালটমেন্ট নামেও পরিচিত ছিল, এর মাধ্যমেই পদাধিকারীদেরও বেছে নেওয়া হতো। যেখানে নির্বাচনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই সেখানে সুষ্ঠু ব্যবস্থা চালু করা অথবা বর্তমান ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতাকে আরো বাড়ানোর প্রক্রিয়াকেই নির্বাচনী সংস্কার বলে বর্ণনা করা হয়।

নির্বাচনের ফলাফল ও এ সংক্রান্ত অন্যান্য পরিসংখ্যান নিয়ে গবেষণাকে (বিশেষ করে আগাম ফলাফল আন্দাজ করার বিষয়টি) সেফোলজি বলে। নির্বাচিত করার মানে হলো “বাছাই করা অথবা একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কোনো কোনো সময় অন্য ধরনের ব্যালট ব্যবহার হলেও যেমন গণভোটে হয়ে থাকে, তাকেও নির্বাচন হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই গণভোট ব্যবস্থা রয়েছে।

আমাদের বাংলাদেশে জনগণের ভোটে সরকার গঠন হয়। ৩০০ টি আসনের জন্য ৩০০ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়। তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভোটে আইন পাশ করা হয়। শুধু তাই নয়, তাঁদের থেকে বাছাই করে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর পদ দেয়া হয়। এখন কথা হলো এসব কাজে কে যোগ্য বা অযোগ্য তা নির্ধারিত হবে আমার আপনার ভোটে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার ক্ষমতা যদি এমন কোনো লোককে চাপিয়ে দেয়া হয়, যার সাথে ঐ এলাকার ভোটারের কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ নাই, তাহলে ঐ প্রার্থী নির্বাচিত হওয়া তো দূরের কথা জনগণ তাকে বর্জন করতে বাধ্য। তাহলে আমরা অসুস্থ মনোনয়নে আগ্রহী হব কেন? কেনই বা এটি নিয়ে তামাশা করবো। এখনো সাবধান হওয়ার সময় আছে। সবাই এক হোন। তৃণমূলের গ্রহণযোগ্য নেতা নির্বাচন করুন এবং তাকেই দলীয় মনোনয়ন পত্র সংগ্রহের সুযোগ দিন। না হয়, আপনিও অসুস্থ মনোনয়নের জালে আটকা পরবেন।

পরিশেষে প্রত্যেক দলেন নেতা কর্মীদের কাছে বিনীত অনুরোধ, আপনার দলকে বাঁচাতে হলে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতাকে নমিনেশন পাওয়ার সুযোগ করে দিন। নতুবা আপনি ও আপনার দল অন্ধকার রাজনীতিতে বন্দি হয়ে যাবে। ফিরে আসুন, দলকে জাগিয়ে তুলুন। প্রতিটি আসনের বিপরীতে যোগ্য একজনকে মনোনিত করুন। তখনই দলের প্রধান সন্তুষ্ট হবেন এবং সার্বিক সহযোগিতা করবেন।

লেখকঃ শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও মানবাধিকার কর্মী।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •