cbn  

বিশেষ প্রতিবেদক:

নাগরিকত্ব, নিজ জমিতে ফেরা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নয়। পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য তালিকা তৈরির কথা শুনে তাদের অনেকেই ক্যাম্প ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশে সফর করা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অভিমত, রাখাইনে প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। তবে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানান, ১৫ নভেম্বর থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রস্তুত।

টেকনাফ কেরুণতলী প্রত্যাবাসন ঘাট। এখানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরি হয়েছে ৩৩টি ঘর ও একটি জেটিঘাট। একইভাবে এই ঘাটটির মতো ঘুমধুমে আরো একটি ঘাটে তৈরি হয়েছে ৫৭টি ঘর। এসব ঘাট দিয়ে ১৫ নভেম্বর শুরু হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। সোমবার সরজমিনে টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি গিয়ে এসব চিত্র দেখা যায়।

এদিকে, দু-দেশের সরকারের গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আর মাত্র একদিন পর ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। সময় সন্নিকটে আসলেও সেই ধরণের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। অন্যদিকে রোহিঙ্গারাও নানা দাবি তুলে প্রত্যাবাসন বিঘ্ন ঘটাতে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার তৃতীয় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে চলতি মাসের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় ৪৮৫ পরিবারের ২ হাজার দুইশ ৬০ জন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই লক্ষ্যে কাজও করে সরকার।

টেকনাফের কেরুনতলীতে প্রত্যাবাসন ঘাট প্রস্তুত হয়েছে বলে দাবি করছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসন কমিশন। কিন্তু আদৌ বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) প্রত্যাবাসন শুরু হবে কি না তা নিয়ে স্পষ্ট কোন বক্তব্য দিচ্ছে না সরকারের দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা। তবে তারাও আশাবাদী। টেকনাফের কেরুনতলীতে প্রত্যাবাসন ঘাট প্রস্তুত হওয়ার কথা বললেও সেখানে মাত্র একদিন পর প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে তেমন কোন তৎপরতা নেই।

বৃহস্পতিবার প্রত্যাবাসন হলে আজ-কালের মধ্যে তালিকা অন্তর্ভুক্ত রোহিঙ্গাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো। কিন্তু সেই ধরণের কোন প্রস্তুতি নেই। তাই অনেকে ধারণা করছেন নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী প্রত্যাবাসন বিঘ্ন ঘটতে পারে।

এদিকে, মিয়ানমার সফরের পর গত শনি ও রোববার জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন এস বার্গনার এবং যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকা-এশিয়ার শরণার্থী ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক উপসহকারী মন্ত্রী রিচার্ড অলব্রাইট কক্সবাজারে এসে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাদের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য এখনো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হয়নি। একই অভিমত রোহিঙ্গাবিষয়ক জেলা টাস্ক ফোর্সের সদস্যেরও।

রোহিঙ্গাবিষয়ক জেলা টাস্কফোর্স সদস্য দিদারুল আলম রাশেদ বলেন, ‘গতবছরও রোহিঙ্গাদের নেওয়ার কথা হলেও তারা আদৌ নেয়নি। এই যে আবার তাদের নেওয়ার কথা চলছে, আমার কাছে সেটাও সন্দেহজনক।’

এ অবস্থায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কথা শুনে আতঙ্কে আছেন রোহিঙ্গারা। তাদের দাবি, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও নিজ জমিতে ফেরার কোনো নিশ্চয়তা না দেওয়ায় দেশে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রত্যাবাসন বিঘ্ন ঘটাতে অপতৎপরতা শুরু করেছে রোহিঙ্গারা। নানা দাবি তুলে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েকদিন খোঁজ নিয়ে এমন কয়েকটি পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে। আবার যারা (তালিকায় অন্তর্ভুক্ত) ক্যাম্পে এখনো আছে, তারা দাবি করছে তাদের শর্তগুলো পূরণ না হলে তারা মিয়ানমারে ফিরবে না। সোমবার টেকনাফের উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে (ক্যাম্প-১) কথা হয় রোহিঙ্গা মো. আমিনের (৪৫) সাথে। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিনিসহ আটজন।

তিনি দাবি করছেন, ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মাহাদু তাকে ডেকে নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করেছেন। এমনকি প্রত্যাবাসন তালিকায় তার পরিবারের নাম আছে বলে জানায় ওই রোহিঙ্গা নেতা।

মো. আমিন জানান, ‘আমাদেরকে কোন কিছু স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের কিছু নির্ধারিত দাবি আছে; সেগুলো পূরণ না হলে কোন অবস্থাতেই ফেরত যাবো না। কারণ দাবি পূরণ না হলে সেদেশে (মিয়ানমার) গিয়ে আবারও নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে তাদের।’ শর্তগুলোর বিষয়ে তিনি জানান, তাদেরকে প্রথমত জাতীয়তা সনদ দিতে হবে। সেই দেশে নিরাপদভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে গিয়ে ক্যাম্পে থাকবে না, তাদের নিজস্ব বসতভিটায় বসবাসের সুযোগ দিতে হবে। এবং তাদের উপর চালানো নির্যাতন-গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

একই ক্যাম্পের সি-ব্লকের বাসিন্দা মো. কাশেম (৪৫) ও বি-ব্লকের নুরুল হক জানান, কয়েকদিন আগে মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) মাহাদু তাদেরকে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম আছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এখন তারা ফেরত যেতে প্রস্তুত নয়। আগে তাদের দাবিগুলো সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে হবে।

সম্প্রতি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রতিনিধি দল উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসলে, সেখানেও রোহিঙ্গারা তাদের দাবিগুলো মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে তুলে ধরেন। জানা গেছে, প্রত্যাবাসন তালিকায় সম্ভাব্য নাম আছে শুনে অনেক রোহিঙ্গা নাগরিক ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। তারা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতাদের কাছে নানা ধরণের দাবি তুলে প্রত্যাবাসন বিঘ্ন ঘটাতে গা ঢাকা দিচ্ছে। জামতলী ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গা নেতা জানান, প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম উঠার খবর পেয়ে অনেক রোহিঙ্গা গা ঢাকা দিয়েছে এবং দিচ্ছে। কেউ এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে চলে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকার খবর পেয়ে জামতলী ও উনচিপ্রাংয়ে তিনটি পরিবার ঘরে (আশ্রয় শিবির) তালা ঝুলিয়ে দিয়ে অন্যত্র চলে গেছে।

তিনি আরও জানান, তালিকায় সম্ভাব্য নাম আছে এমন অনেক রোহিঙ্গা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তাদের ফেরত না যাওয়ার বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাচ্ছে। এই রোহিঙ্গা নেতারও দাবি, শর্তগুলো পূরণ না হলে তারা ফেরত যেতে রাজি নয়। কোন ক্যাম্প থেকে এবং কোন কোন রোহিঙ্গাদের প্রথম দফায় প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা না হলেও অনেক রোহিঙ্গা নিজেদের নাম প্রত্যাবাস তালিকায় আছে দাবি করে ক্যাম্প থেকে সরে যাচ্ছে।

আবার অনেকে প্রত্যাবাসন এড়াতে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বরাবরের মতই জানালেন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুতি চলছে। সবকিছুই প্রস্তুত; দেখা যাক কি হয়। এদিকে মিয়ানমারও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সাথে একমত। এনিয়ে তারাও প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়েছে। প্রথম দফায় ১৫০ জন রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া হতে পারে। নৌপথ এবং স্থলপথে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া হবে। যাদেরকে নৌপথে নিয়ে যাওয়া হবে, তাদেরকে নাফখোয়া ক্যাম্পে রাখা হবে বলে জানা গেছে।

গত ৭ নভেম্বর মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আসিয়ান বিষয়ক বিভাগের পরিচালক সোয়ে হান রেডিও ফ্রি এশিয়াতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে এক সাক্ষাৎকার দেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই পথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হবে। প্রথম দফায় তারা (মিয়ানমার) ৩০০ জন রোহিঙ্গা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। ২য় দফায় ২০০ জনকে নিয়ে যাবে। প্রসঙ্গত, গত বছর ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে সে দেশ থেকে প্রাণে বাচঁতে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

গত বছরের ২৪ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ দ্বি-পাক্ষিক চুক্তি করে। চুক্তিতে দুই মাসের মাথায় প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনও রোহিঙ্গা রাখাইনে ফেরত যেতে পারেননি।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •