: মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :

১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সাল। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’—স্লোগান ধারণ করে রাজপথে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। মিছিলটি ঢাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে পৌঁছার পর মিছিলের সামনে থাকা নূর হোসেন তৎকালীন সরকারের পেটুয়া বাহিনীর বেপরোয়া বুলেটে গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর তাজা রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ, শহীদ হন এই গণতন্ত্রের বীর সৈনিক। নুর হোসেন শহীদ হওয়ার পর একই সালের ১১ ও ১২ নভেম্বর টানা ২ দিন সফল হরতাল পালন করা হয়। বেগবান হয় স্বৈরাচারবিরোধী ঐতিহাসিক আন্দোলন। তীব্র থেকে তীব্রতর হয় মুক্তিকামী জনতার উত্তাল সংগ্রাম। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।

শহীদ নুর হোসেনের গ্রামের বাড়ী পিরোজপুর জেলার মটবাড়িয়া উপজেলার ঝাটিবনিয়া গ্রামে। স্বাধীনতার পর নুর হোসেনের পরিবার ঢাকার ৭৯/১ বনগ্রাম রোডে চলে আসে। নুর হোসেনের জন্ম ১৯৬১ সালে। সে হিসাবে ১৯৯০ সালে আন্দোলনের সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ২৬ বছর। অষ্টম শ্রেণী পাশ নুর হোসেন পেশায় একজন ড্রাইভার। শহীদ নুর হোসেনের পিতার নাম মুজিবুর রহমান ও মাতার নাম মরিয়ম বিবি।
অধিকার আদায়ে শহীদ নুর হোসেনের বুকে পিটের লেখা স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। চেতনা আর উৎসাহের চিরন্তন প্রতীক হয়ে রয়েছে শহীদ নুর হোসেন। রাজনৈতিক দল গুলো শহীদ নুর হোসেনকে তাদের দলের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে টানাটানি করুক বা নাই করুক, নুর হোসেনের ত্যাগ গণতন্ত্রককামী মানুষের আজীবন আদর্শ ও প্রেরনা। অবিচল সংগ্রাম আর মুক্তির রণতরী। অবিস্মরণীয় হয়ে রয়েছে ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সাল। গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেনের জীবন উৎসর্গ বৃথা যায়নি। আমরা তাকে মনে রেখেছি পরম শ্রদ্ধাভরে।

নুর হোসেন বুলেটবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়ার স্পটটির নামকরন করা হয়েছে শহীদ নুর হোসেন চত্বর। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী তৎকালীন গণতান্ত্রিক বিএনপি সরকার নুর হোসেনের সেই ঐতিহাসিক ছবিসহ ২ টাকা মূল্যের স্মারক ডাকটিকেট বের করে। কিন্তু গণতন্ত্র উদ্ধারে প্রাণ উৎসর্গ করা চির প্রেরনাময়ী এই বীরের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে জাতি এখনো কি পেয়েছে? আজও কেন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, ভোটের অধিকার, বাক স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, গণমাধ্যম, বিচারবিভাগ সহ সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা আদায়ের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে? তাহলে কি ৩১ বছর আগের নুর হোসেনের ত্যাগ বৃথা গেছে? না, বীরের জাতি বীরের ত্যাগকে উত্তরসূরীরা কখনো বৃথা যেতে দেবেনা।

আন্দোলন সংগ্রামে প্রেরনার নিরন্তর উৎস শহীদ নুর হোসেনের রক্ত মাখা পিচ্ছিল রাজপথকে সাক্ষী রেখে চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলন শতভাগ সফল করেই মুক্তিকামী জনতা ঘরে ফিরবে ইনশাল্লাহ্। শহীদ নুর হোসেন হোক চলমান আন্দোলনে গণমানুষের অনুপ্রেরনার দূর্জয় হাতিয়ার। হোক মুক্তিকামীদের সবসময় চলার পাথেয়। এই হোক আজকের ঐতিহাসিক শহীদ নুর হোসেন দিবসে গণতন্ত্রকামী মানুষের দৃঢ় অঙ্গীকার। অধিকার আদায়ে অুনুপ্রেরনার প্রতীক ‘বাংলার ক্ষুদিরাম’ নামে খ্যাত শহীদ নুর হোসেন দিবসে এ বীরের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধান্ঞ্জলি।
(লেখক : এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট, ঢাকা।)

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •