এম. রিদুয়ানুল হক:
ছোট কালে জোরগলায় ক্লাসে কয়েকটি লাইন বেশি পড়ানো হতো। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ” পড়ালেখা করে যেই, গাড়ি-ঘোড়ায় চড়ে সেই”। চমৎকার উক্তি! আসলে কি তাই? এটার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু এটি, কার জীবনে কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে আমার জানা নেই। তবে আমার জীবনে এখনো ঘোড়াই চড়ার সুযোগ হইনি। গাড়িতে অনেক চড়েছি, রিকসাও কিন্তু বাকি রাখি নি। মজার বিষয় হলো, বর্তমানে উচ্চ শিক্ষিত লোক কয়জন পাবেন, যাদের নিজস্ব গাড়ি-ঘোড়া রয়েছে? হয়তঃ হাজারে ২/১ জন। এখানে চোখ দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। কারণ গাড়ি-ঘোড়া সব অশিক্ষিতদের দখলে। হয়তঃ আমার ধারণা ভুল হতে পারে। কিন্তু আপনার ধারণা তো ভুল হতে পারে না। আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলাম, তখন আমাদের স্কুলে শিক্ষা অফিসার এসেছিলেন। ক্লাসে প্রবেশ করে আমাদের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন রেখেছিলেন। ভাগ্যক্রমে আমার কপালে একটি প্রশ্ন চলে এলো- তুমি বড় হয়ে কি হবে? শরীরের তাপমাত্রা তখনই বেড়ে যাওয়ার পথে! তারপরও বলেছিলাম- আমি শিক্ষক হবো। ওনি হেসে আরেকজনের কাছে প্রশ্ন নিয়ে চলে গেলেন। তার কাছে প্রশ্ন করলেন- তুমি বড় হয়ে কি করবে? সে সহজেই উত্তর দিল- আমি বড় হয়ে টাকা কামাবো। শিক্ষা অফিসার অবাক হলেন এবং বললেন- টাকা কামানোর জন্য কি পড়ালেখা? তখন ছোট্ট ছেলেটি চুপ হয়ে রইলো। কাজ শেষ করে শিক্ষা অফিসার চলে গেলেন। কিন্তু তার কথাটি আমার কাছে এখনো রয়ে গেলো। আসলে সত্যি কথা হলো, বর্তমানে টাকা দিলে শিক্ষা কেন, শিক্ষা অফিসকেও কেনা যায়! বর্তমানে যে কেউ শিক্ষিত বলেন বা অশিক্ষিত বলেন টাকা ছাড়া কিছুই চিনে না। এখনের শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি বড় হয়ে কি করবে? তখন সরাসরি উত্তরে বলবে- চাকুরি করবো এবং টাকা কামাবো, ডাক্তার হবো এবং টাকা কামাবো ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে উত্তরটি যথাযথ। কারণ এতো কষ্ট করে পড়ালেখা করার পর চাকুরি তো ফ্রি করা যায় না। টাকা তো লাগবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আধুনিক যুগে সব ধরনের বড় পদগুলো দখল করে রেখেছে অল্পবিদ্যাধারীরা। শুধু কি তাই, জোর গলায় যারা কত বলতে পারে তারাই বর্তমানের হর্তাকর্তা। সর্বোচ্চ অান্ডার মেট্টিক উচ্চ শিক্ষিতরা এখন উচ্চ আসনে এবং অসংখ্য অর্থের মালিক তারা। কম বয়সে দলীয় টিকেট নিয়ে গাড়ির মালিক, ঘোড়ার মালিক হয়ে যায় সহজেই। তাদের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে শিক্ষিতরা অসহায়ের মতো পিছনে পড়ে থাকে। এ থেকে মুক্তি চাই শিক্ষিতরা।

কেন এত তালবাহানা! কেন এত তামাশা! বর্তমানে টাকা ছাড়া তো কিছুই হয় না। মেম্বার থেকে শুরু করে মন্ত্রী সচিব পর্যন্ত টাকা আর টাকা। ব্যবসায়ীরা দখল করে রেখেছে রাজনৈতিক পদসহ বড় বড় মন্ত্রী-এমপির পদ। শিক্ষা তাদের কাছে তুচ্ছ। তাহলে শিক্ষিতরা কেন টাকা চাইবে না। তাদের কি সংসার নেই? টাকা কি শুধুমাত্র নেতাদের জন্য? এটা কখনো হতে পারে না। আমিও টাকা চাই! উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে মানবসেবার পেছনে কয়জনে বা সময় দেয় তাও আবার হিসেব নেই। আগের যুগে শুনা যেত, আমি ডাক্তার হয়ে মানবসেবা করবো, দেশের সেবা করবো। কিন্তু বর্তমানে তা শতভাগ মিথ্যা।

অল্পশিক্ষিতরা কোটি কোটি টাকা আয় করবে, আর শিক্ষিতরা হাজার টাকা আয় করলে সমালোচনার ঝড় উঠে। আজ কালোবাজীরা তাদের অর্থের জোরে উচ্চ শিক্ষিতদের প্রতিনিয়ত তাড়া করছে। প্রশাসন তাদের পিছনে শক্তি জোগাড় দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, দিন রাত শিক্ষিতদেরকে তাদের বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। কেন এমন হচ্ছে? কোনো উত্তর নেই! তাইতো আমার বা আমাদের পড়ালেখা টাকার জন্য। টাকা ছাড়া যেহেতু কিছুই করা যায় না, সেহেতু টাকার পিছনে শিক্ষিতদের দৌঁড়তে হচ্ছে আজ।

আপনি তেমন পড়ালেখা না করে সমাজ বা রাষ্ট্রের নেতা হবেন আর শিক্ষিতরা বসে বসে আঙ্গুল চুষবে তা কি হয়! আজ আমরাও উচ্চ আসনে যেতে চাই। বাধা দিবেন না! আপনার কাজ আপনি করেন, আর আমার কাজ আমাকে করতে দেন। তাই তো ভদ্রতা। আমরাও গাড়ি-ঘোড়ার মালিক হতে চাই। সমাজ বা রাষ্ট্রের নেতা হতে চাই। যদি গণতন্ত্রে বাধা না থাকে, তাহলে আর দেরি কেন। আসুন, পড়ালেখা করি। পাশাপাশি অর্থ আয় করার পথ সুগম করি!

লেখকঃ
এম. রিদুয়ানুল হক
শিক্ষক, সংবাদকর্মী, মানবাধিকারকর্মী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •