আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার ॥


গত মঙ্গলবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর আশা করা হলেও তা নিয়ে এখন অনিশ্চিতাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কারণে এই জনগোষ্ঠীটি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে। জাতিসংঘও তাদের পাশ কাটিয়ে করা দুদেশের চুক্তিটি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। বুধবার মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের সময়ও রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসাবে ৬ দফা দাবি দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের এসব দাবি এবং জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থার মন্তব্যে চলতি মাসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে জনমনে ঘোরতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) তৃতীয় বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক জানিয়েছেন যে, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। এবিষয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্বস্ত করতে
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট সুয়েসহ মিয়ানমার সরকারের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের নিয়ে বুধবার তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এসময় ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসাবে রোহিঙ্গারা তাদেরকে ছয় দফা শর্ত দেয়। শর্তগুলো হল- ১. জমিজমা ফেরত: মিয়ানমারে যাদের সহায়-সম্পদ ও বসতভিটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে তাদের সেই সম্পত্তি ফেরত দিতে হবে। তারা মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার আগেই এই ব্যবস্থা করতে হবে, ২. মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান: মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এরফলে সবকিছু থেকে বঞ্চিত তারা। তাই তাদের নাগরিকত্ব ফেরত দিতে হবে, ৩. রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিচার: রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের উপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে। নির্বিচারে গণহত্যা করা হয়েছে। তারা এই নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান, ৪. মিয়ানমারে ক্যাম্পে থাকবে না রোহিঙ্গা: মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের রাখার জন্য যে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে তারা থাকবে না। তারা চায়, মিয়ানমারে তাদের ফেলে আসা বসতভিটায় আবারও নতুন করে বসতি গড়ে তুলবে। ৫. নিরাপত্তা জোরদার: রাখাইন রাজ্যে যেসব জায়গায় রোহিঙ্গাদের বসতি ছিল সেখানে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। যাতে রোহিঙ্গাদের উপর আর কোন নির্যাতন না হয় এবং ৬. আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে সব শর্ত মেনে নেওয়া: রোহিঙ্গারা যেসব শর্তে মিয়ানমারে ফেরত যাবে, সেগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে এসে মেনে নিতে হবে। যাতে করে ওয়াদা ভঙ্গ করতে না পারে।
তবে রোহিঙ্গাদের দাবিগুলোর ব্যাপারে তাৎক্ষণিক কোন উত্তর দেননি মিয়ানমরের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে। পরে প্রেস ব্রিফিং এ তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেয়া দাবিগুলো মিয়ানমার সরকারের কাছে যথাযথভাবে পৌছে দেয়া হবে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) শুক্রবার তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার কারণে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীটি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে এই পরিকল্পনায় জাতিসংঘকে অন্তর্ভুক্ত না করায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নভেম্বরের মাঝামাঝিতে প্রস্তাবিত প্রত্যাবাসন পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে অত্যন্ত ‘সংকটময় পরিস্থিতিতে’ ফেরত পাঠানো হবে, যেখানে তাদের জীবন ও স্বাধীনতা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা তৈরির সময় জাতিসংঘের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। শরণার্থীরা নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
মানবাধিকার সংস্থাটির শরণার্থী অধিকার বিভাগের পরিচালক বিল ফ্রেলিক বলেন, ‘মিয়ানমারের সরকার ফেরত নেয়ার কথা বলেই যাচ্ছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা যে হিং¯্রতা ও দমন-নিপীড়ন থেকে পালিয়ে এসেছে তাদের আবার সেরকম অবস্থার মধ্যেই ফেরত পাঠানো হবে না এমন আশ্বাস দিতে মিয়ানমার কিছুই করেনি।’
জাতিসংঘকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা এগিয়ে নিলে তার ফলও বাংলাদেশের জন্য ভালো হবেনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। এতে করে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে গত এক বছরে আন্তর্জাতিক মহলে যে সুনাম কুড়িয়েছে তা পুরোটাই নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করেন বিল ফ্রেলিক।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা ৩০ ও ৩১ অক্টোবর প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তৃতীয়বারের মতো বৈঠকে বসেন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রত্যাবাসন চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হয়েছিল। এই পরিকল্পনার আওতায়, নভেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে ৪৮৫টি পরিবারের ২,২৬০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়ার কথা জানানো হয়। তবে যাদেরকে ফেরত পাঠানোর জন্য তালিকাভূক্ত করা হয়েছে তাদেরকে তা না জানিয়েই করা হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা যে তালিকা তৈরি করেছি তাতে যাদের নাম রয়েছে তারা ফেরত যেতে বিশেষ আগ্রহী, তাই তাদের নাম রাখা হয়েছে বিষয়টা এমন নয়।’
এছাড়া জাতিসংঘের দুটি সংস্থাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা করার বিষয়ে গত জুনে মিয়ানমারের সাথে সমঝোতা চুক্তি সই করে। এরপর থেকে জাতিসংঘের সংস্থা দু’টি সীমিত আকারে রাখাইন রাজ্যের অবস্থা পর্যালোচনা করা শুরু করেছে।
তাদের মতে, বাংলাদেশ বা মিয়ানমার, কোনো দেশের কর্মকর্তারাই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর তালিকা প্রস্তুত করার সময় ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে কথা বলেনি। এই তালিকায় যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাম আছে তাদের সঙ্গেও কোনো আলোচনা করেনি দুই দেশের কর্মকর্তারা।
জাতিসংঘ এই পরিকল্পনাকে ‘তাড়াহুড়ো করে তৈরি এবং অকালপক্ক (ৎঁংযবফ ধহফ ঢ়ৎবসধঃঁৎব)’ হিসেবে অভিহিত করে এর বিরোধিতা করেছে।
ইউএনএইচসিআর’র মুখপাত্র আন্দ্রেজ মাহেচিক ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের অবস্থা রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফেরত যাওয়ার মতো নিরাপদ বলে মনে করছি না আমরা। একারণে ইউএনএইচসিআর এই পর্যায়ে রাখাইন রাজ্যে কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনও সহায়তা করবে না।’
গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। পরে গত ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেওয়ার সুনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ বলছে, এখন পর্যন্ত কোনও রোহিঙ্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •