মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :


ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে অবস্থানরত বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বেকসুর খালাস পেয়েছেন। রায় ঘোষনার জন্য ৭ম বারের মতো অপেক্ষমান থাকা মামলাটি ২৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকেল পৌনে ৩টায় শিলং নর্থইষ্ট খাসিয়া হিল আদালতের প্রথম শ্রেণীর হাকিম মিঃ ডিজি খার সিং সালাহউদ্দিন আহমদকে মামলা থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে রায় প্রদান করেন। ভারতের বৈদেশিক নাগরিক আইনের ১৪ ধারায় সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে নর্থইষ্ট খাসিয়া হিল আদালতে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। মামলার সংক্ষিপ্ত রায়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আহামদকে স্বদেশে পাঠানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি’র নিকট হস্তান্তরের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ভারতের শিলং আদালতের রায়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বেকসুর খালাস পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রতিবেদককে মুঠোফোনে বলেন, এই রায়ের মাধ্যমে গুম, খুন সংক্রান্ত সরকারের এযাবৎ প্রদত্ত সবধরনের বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বনোয়াট প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় গুম, খুনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিয়ে প্রতিদিন প্রদত্ত একই ধরনের হাস্যকর বক্তব্য সালাহ উদ্দিন আহমদের মামলায় বিদেশের আদালতের দেয়া রায়ে অন্তসার শূণ্য প্রমাণ করেছে। এসংক্রান্ত বিএনপি সহ বিরোধীমতের অনুসারীদের বক্তব্যই সঠিক ও যথার্থ রয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে নিরপেক্ষ ও বিচারবিভাগীয় তদন্ত করে বিগত এক দশকে গুম সহ বিচারবর্হিভূত সকল খুন ও অপরাধের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেয়া হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদের শিলং আদালতে দেয়া মামলার রায়ের ব্যাপারে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির একটানা ৬ বারের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের সদস্য সচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এই প্রতিবেদককে বলেন, সালাহউদ্দিন আহামদ একজন সাবেক মন্ত্রী, ৩ বারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপি’র নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। এরকম মেধাবী, জনপ্রিয় ও উচুমানের একজন রাজনীতীবিদ মায়ানমারের রোহিঙ্গা শরনার্থীর মতো ভারতে অনুপ্রবেশ করবেন, সেটা কখনো বিশ্বাসযোগ্য ছিলনা। ভারতের আদালতে তিনি তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই রায় উপমহাদেশের আদালত সমুহে একটা নতুন নজীর সৃষ্টি করেছে বলে তিনি জানান। সালাহউদ্দিন আহমদের বাংলাদেশের মামলাসমুহের ব্যাপারে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, তাঁর কোন মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে শাস্তি হয়নি। নিম্ম আদালতে যেসকল মামলায় ফরমায়েশী রায় হয়েছে, সেসব রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপীল করায় নির্বাচনে প্রতদ্বন্ধিতা করতে এদেশের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী তাঁর জন্য কোন সমস্যা নেই বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, দলীয় সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে দেশে ফিরে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে চাইলে তিনি অংশগ্রহন করতে পারবেন। তাছাড়া সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দায়েরকরা এদেশের সকল রাজনৈতিক মামলায় আইনী প্রক্রিয়ায় লড়ে তিনি বেকসুর খালাস পাবেন বলে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এদিকে, রায়ের পর সালাহ উদ্দিন আহামদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা চকরিয়া-পেকুয়াতে সাধারণ মানুষের মনে খুশীর বন্যা নেমেছে। পেকুয়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ ইকবাল হোসেন বলেন, সালাহ উদ্দিন আহামদ বেকসুর খালাস পাওয়ায় এ এলাকার মানুষ খুবই আনন্দিত, মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে ঘরে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় উদগ্রীব রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে শোকরিয়া সভা করেছি, ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরন করা হচ্ছে। এই রায়ের মাধ্যমে আওয়ামী বাকশালীরা, যারা এই এলাকার সাধারণ মানুষকে নেতৃত্বের নামে জুলুম অত্যাচার করেছে, তাদের স্বপ্ন এখন দিবাস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
২০১৫ সালে বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র মুখপাত্র হিসাবে সফলভাবে দায়িত্বপালনকালে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকাস্থ উত্তরার একটি বাড়ী থেকে আইনশৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে অচেনা মুখোশধারী অপহরনকারীরা সালাহউদ্দিন আহমদকে চোখ বেঁধে গুপ্ত স্থানে তুলে নিয়ে যায়। তখন থেকে দীর্ঘ ৬২ দিন নিখোঁজ থাকার পর একই বছরের ১১ মে সালাহউদ্দিন আহমদকে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় উত্তর পশ্চিম ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে গলফ লিংক মাঠে পাওয়া যায়। সেখান থেকে তাঁকে প্রথমে শিলং মানসিক হাসপাতালে, পরে শিলং সিভিল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মেঘালয় রাজ্যের পুলিশ ২০১৫ সালের ৩ জুন ভারতে অবৈধ প্রবেশের অভিযোগ এনে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রথমে হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরে শিলং জেলে পাঠানো হয়। পরে শিলং আদালত থেকে শিলং শহর ছেড়ে না যাওয়ার শর্তে বিজ্ঞ আদালত সালাহউদ্দিন আহমদকে জামিন প্রদান করেন। তখন থেকে নির্বাসিত অবস্থায় দীর্ঘ সাড়ে ৩ বছর ধরে খাসিয়া খ্রীষ্টান অধ্যূষিত এলাকা শিলং শহরে সানরাইজ গেষ্ট হাউজ নামক একটি দোতলা ভাড়া বাড়ীতে তিনি বসবাস করে মামলা পরিচালনা করে আসছেন। মামলা দায়েরের পর মেঘালয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আহমদকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করে ২০১৫ সালের ২২ জুলাই মামলার চার্জশীট দেয়া হয়। চার্জশীটে “সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলার গ্রেপ্তারী পরোয়ানা এড়াতে উদ্দ্যেশ্য প্রনোদিতভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছিল”। সালাহউদ্দিন আহামদের কৌশুলী ভারতের বিখ্যাত আইনজীবী মিঃ এস পি মোহন্ত জানান, সালাহউদ্দিন আহমদ স্বেচ্চায় ভারতে অনুপ্রবেশ করেননি, তাঁকে অপহরনকারীরা জোর করে চোখ বাঁধা অবস্থায় শিলং গলফ লিংক মাঠে এনে রেখে দিয়েছে, সেটা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে আমরা প্রমান করতে সক্ষম হয়েছি। মিঃ এসপি মোহন্ত বলেন, মামলা শুনানীর সময় আদালতে তাঁরা এ বিষয়ে বিভিন্ন রিপোর্ট সহ আন্তজার্তিক বিভিন্ন আইন ও নজীর উপস্থাপন করে আদলতকে সন্তষ্ট করেছি। তাই আদালতে ন্যায় বিচার পাবো বলে দৃঢ় আস্থাশীল ছিলাম। ২৬ অক্টোবর আদালতের রায়ে সালাহউদ্দিন আহমদ মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাওয়ায় সে আস্থার যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলায় প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত ও আইনী যুক্তি উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় তারা মামলায় হেরেছে। রায় ঘোষনার সময় আদালতে সালাহউদ্দিন আহামদ, তাঁর আইনজীবী মিঃ এস পি মোহন্ত, সরকার পক্ষের আইনজীবী মিঃ রাজীব নাথ সহ অনেক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন বলে সালাহউদ্দিন আহমদের একান্ত সহকারী সাফওয়ানুল করিম জানিয়েছেন। মামলাটির চুড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর রায় প্রচার পর পর ৬ ধার্য তারিখ পিছিয়েছিল। ৭ম ধার্য তারিখে ২৬ অক্টোবর শুক্রবার মামলাটির রায় ঘোষনা করা হয়। এদিকে, সালাহউদ্দিন আহমদের একান্ত সচিব সাফওয়ানুল করিম জানান, মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাওয়ার পর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আসার জন্য সালাহউদ্দিন আহামদ ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন। সালাহউদ্দিন আহমদ এদেশের মাটি ও মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে প্রতি মুহুর্ত উদ্বিঘ্ন থাকেন। সাফওয়ানুল করিম জানান, শিলং এর আদলতে সঠিক, ন্যায়, নিরপেক্ষ ও সুষ্ট বিচারে মাধ্যমে বেকসুর খালাস পেয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ মহান আল্লাহতায়লার কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপন করেন ও আইনজীবী, দেশবাসীসহ সকলের নিকট আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। শিলং আদালতে প্রদত্ত রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভারত থেকে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে শিঘ্রি ফিরতে পারবেন বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি দেশবাসীর কাছে তাঁর শারিরীক সুস্থতা, দ্রুত স্বদেশে ফেরার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া ছেয়েছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •