cbn  

এমএ সাত্তারঃ
কক্সবাজারে সরকারি বন সম্পদের ওপর দখলবাজদের আগ্রাসন থেমে নেই। রক্ষিত ও সামাজিক বনায়নের বৃক্ষ নিধনের মহোৎসব চলছে। ভূমিদস্যুরা বনের জমিতে গড়ে তুলছে ইমারত।
গত প্রায় এক দশকে কক্সবাজারে উজাড় করা হয়েছে কয়েক হাজার একর বনভূমি।
বনবিভাগের উদাসীনতা, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং রক্ষণাবেক্ষণে অসচেতেনতাই বন ধ্বংসের মূল কারণ বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
কক্সবাজারের মতোই সারাদেশে গত পাঁচ দশকে বন ও বনভূমি পরিমান কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। বন ধ্বংসের ফলে মারাত্নক হুমকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।পরিবেশ ভারসান্য রক্ষায় মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার অপরিহার্যতার কথা বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে এখন বনভূমির পরিমাণ মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ।অবশ্য সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সংরক্ষিত বনভূমির ব্যক্তি পর্যায়ে রোপন করা গাছপালা, সামাজিক বনায়ন ও উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীসহ নানা উদ্যোগ মিলিয়ে দেশে বনভূমির পরিমান এখন ১৬থেকে ১৭শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০২০ সালের মধ্য ২০ শতাংশ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে সরকার।
কক্সবাজারে সরকারি বনভূমি দখল করে ক্ষমতাধররা কারখানা, বসতবাড়ি বানালেও দেখার যেন কেউ নেই। বন রক্ষার দায়িত্ব বনবিভাগের তবে দৃশ্যত তাদের কাজ মাস শেষে বেতন নেওয়া, দখলদারদের বিরুদ্ধে লোক দেখানো অভিযান ও মামলা হলেও বনভূমি উদ্ধারে কর্মকর্তাদের তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনা। মামলার কারণে দখলদারেরা নানা কৌশল ও আইনের ফাঁক দিয়ে বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এ কথা অস্বীকার করেছেন বনবিভাগের কর্তাব্যক্তিরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন আইনের ৯ ধারার তামাদি মওকূপের ক্ষমতার অপব্যবহার করে শতশত একর অবমুক্ত করে দিচ্ছেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে অবমুক্তির সুযোগ দিয়ে ব্যক্তি নামে নামজারি করে বৈধ করা হচ্ছে বনের জমি।
কক্সবাজার আদালতের এক আইনজীবী বলেন, দুর্বল আইনের কারণে দখলবাজি কমছেনা। আইনত অনুযায়ী ১টি মাত্র গাছ কাটার জন্য বা কয়েকশত একর বনভূমি উজাড় করার শাস্তি একই, ৬ মাস থেকে ৭ বছরের কারাদন্ড বা অর্থদন্ড।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক মামলায়ই প্রকৃত দখলকারীর পরিবর্তে আসামী হিসাবে দেওয়া হয় অন্য লোকের নাম, ঠিকানা দেওয়া হয় ভুল। এভাবে ভুল তথ্য দিয়ে শুরুতেই দুর্বল করে ফেলা হয় মামলা। যার কারণে জবর দখলকারীরা পুন:দখলক্রিয়া চলমান রেখে একের পর এক বনভূমি দখলে নিয়ে যা ইচ্ছা ব্যবহার করছে।
সম্প্রতি পিএমখালী রেঞ্জের খুরুশকুল বিট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তেতৈয়া গুল্লা বাপের পড়ার মৃত আলী হোসেনের ছেলে আবদুল মালেক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বনবিভাগের বিশাল এলাকা জবর দখল করে স্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করাসহ পাহাড় কেটে মাটি, বালি ও বনভূমিতে প্রকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা মুল্যমান সবুজ বনজ গাছ গাছালি কেটে বন উজাড় করে দখল বিক্রি বাণিজ্য করছে।
গত এক সপ্তাহ ব্যবধানে আবারো সংরক্ষিত বনভূমির বিশাল এলাকা দখলে নিয়ে পাহাড় ও সবুজ গাছ গাছালি কেটে একাধিক শ্রমিক দিয়ে জোরালোভাবে ঘর নির্মান করতেও দেখা গেছে।
সরকারি বনভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সবুজ গাছপালা,পাহাড়,ঢালু কেটে ঘর তৈরী, বনভূমি দখল করা আবার দখলবিক্রি বাণিজ্যসহ ভূমি দস্যুরা একের পর এক পরিবেশ বিধ্বংসী ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়ে আসলেও অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেই।
খোঁজ মেলে, স্থানীয় আড়ালে আবদুল মালেকের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে। তারা একএক করে সরকারি বনভূমি জবর দখল করে নিচ্ছে। তার তথ্য প্রমানসহ একাধিক অভিয়োগ থাকার পরও প্রশাসন তার বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি এবং অবৈধ উচ্ছেদও করেনি।
এ ব্যাপারে রেঞ্জ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম  ঘটনাস্থল সরেজমিন গিয়ে নতুন করে উঠানো ঘর ভেঙ্গে ফেলার জন্য গেলে পরিস্থিতি বুঝে আগাননি বলে আমি জানান।
তিনি জানান, নিষেধ করলেও দখলবাজরা তা মানছে না। এদের বিচার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
অভিযোগের ব্যাপারে আবদুল মালেকের নিকট জানতে চাইলে বলেন, ওখানে তার মতো আরো হাজার জনে দখল করেছে। এরপর জিজ্ঞাসিত কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষন চুপ থেকে পরে বলবে বলে ফোন কেটে দিয়ে আর কথা বলেননি। স্থানীয়রা জানান মালেক গং বনভূমি দখল করে ঘর তৈরীর খবর সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তারা অবহিত হয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মানাধীন ঘর ভেঙ্গে ফেলাসহ অবৈধ উচ্ছেদ না করে ফিরে গেছে। তারা আরো জানান আব্দুল মালেক কর্তৃক গত ২/১ দশক আগে থেকে দখল করে নেওয়া এই বন এলাকায় বিভিন্ন প্রকার বনজ গাছে ভরপুর থাকত। আমাদের বাড়ীর পার্শ্ববর্তী হয়েও ভয়ে আমরা ওখানে যেতাম না। এক সময়ে ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে মালেক গং এই অরণ্য বনভুমিতে অবৈধভাবে ঘর করে দখলে নেওয়ার পর থেকে বরাবরের মতই ভূমি দস্যুতা জিইয়ে রাখছে।
কক্সবাজার উত্তর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হক মাহাবুব মোর্শেদ বলেন এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জড়িতদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান। কক্সবাজার সদর থানার ওসি মো: ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন বন মামলার আসামীরা জামিন নিয়ে এলাকায় অবস্থান করে থাকে আর যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে তাদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো পুলিশের নিয়মিত কাজ। কক্সবাজারের বিভিন্ন বিট অঞ্চল সরেজমিনে ঘুরে পাওয়া গেছে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা চোরকে বলে চুরি করতে, আর গৃহস্থকে বলে সজাগ থাকো। চাকরি রক্ষার জন্যই মূলত বনদস্যুদের নামে মামলা দেওয়া হচ্ছে। মামলা চালানো খরচের নামে আবার আসামীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফের জবর দখল কিংবা বনকাটার মৌখিক অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।কোন এলাকায় পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ মারাত্নক আকার ধারণ করলে পরিবেশ সংরক্ষন আইন ১৯৯৫ অনুসারে সরকার সে এলাকাকে সংকটপূর্ণ হিসাবে ঘোষনা করতে পারে।পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয় যে ৭টি এলাকাকে সংকটপূর্ণ ঘোষনা করেছে সে গুলি হলো সুন্দরবন,কক্সবাজার হতে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত,সেন্টমার্টিন দ্বীপ,সোনাদিয়া দ্বীপ,হাকালুকি হাওর,টাঙ্গুয়ার হাওর ও মারজত হ্রদ। এসব সংকটাপন্ন এলাকায় কিছু কার্যক্রম নিষিদ্ধ যেমন গাছ কাটা বা সংগ্রহ,বন্যপ্রাণী ফাঁদে ধরা বা শিকার,শামুক প্রবাল কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণী ধরা বা সংগ্রহ। এমন কর্মকান্ড যা ওই এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রতি হুমকি স্বরুপ এবং ওই এলাকার মাটি,পানি বাতাস দুষিত করে অথবা শব্দ দুষণ ঘটায় এমন কোন প্রতিষ্টান এবং এমন যে কোন কর্ম যা মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর, বন ও বন ব্যবস্থাপনা ১৯২৭ সালের বন আইনের অন্তভূত্ত। বিশ্বে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমান সর্বনিম্ন। ১৮ শতক থেকে ১৯ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং পরবর্তী ব্রিটিশ শাসনামলে বনাঞ্চল বিপুল পরিমানে ধ্বংস করা হয়। কৃষিকাজ সম্প্রসারণের ফলে ব্রিটিশ আমল থেকে বনাঞ্চল সংকোচিত হতে থাকে বলে মন্তব্য করেন পরিবেশবাদীর।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •