cbn  

সিবিএন ডেস্ক:
প্রায় দশ বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা বিএনপি’র আলোচিত প্রায় অর্ধশতাধিক সংস্কারপন্থী নেতাকে এবার ঘরে ফিরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে বিএনপি। হাইকমান্ডের এই উদ্যোগে সরাসরি কেউ বিরোধীতা না করলে ভেতরে ভেতরে সমালোচনার মাঝেও ইতিবাচক দেখছে দলটির নেতাকর্মীরা। তবে দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করে এরফলে দল সারাদেশে সাংগঠনিকভাবে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে, শক্তিশালী হবে এবং আগামীতে দলের মূল নেতৃত্বের পথচলা আরো মসৃণ হবে।

দৈনিক যুগান্তরের সুত্রে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ইচ্ছা ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সবুজ সংকেত পেয়েই আজ দলে ফিরছেন, চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেডএ খান, সাবেক সচিব এএইচএম মোফাজ্জল করিম, সাবেক হুইপ সৈয়দ শহীদুল হক জামাল, রেজাউল বারী ডিনা, সাবেক সংসদ সদস্য এসএ সুলতান টিটু, ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মদ সহিদুজ্জামান, নূরুল ইসলাম মনি, ডা. জিয়াউল হক মোল্লা, জিএম সিরাজ, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টোসহ বেশ কয়েকজন। এ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইতিমধ্যে বিএনপিতে ফেরা সংস্কারবাদী দুই নেতা।

বিকাল ৪টায় গুলশানে দলটির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে যোগ দেবেন একসময়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এসব নেতা।

পর্যায়ক্রমে ‘সংস্কারপন্থী’ অন্য নেতাদেরও দলে ফেরানো হবে বলে জানা গেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনের দাবিসহ দলীয় সাত দফা দাবিতে শিগগিরই চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু করা হবে।

তার আগেই দলকে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতেই এমন সিদ্ধান্ত বিএনপির। সংস্কারপন্থীদের যারা অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য ভুল স্বীকার করে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে আবেদন করেছেন, শুধু তাদেরই দলে ফেরানো হচ্ছে।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এদের অনেককেই মনোনয়ন দেয়া হবে- এমন ইঙ্গিতও তাদের দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে ডা. জিয়াউল হক মোল্লা বলেন, বিকালে গুলশান অফিসে তাদের যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু কী কারণে যেতে বলা হয়েছে, তা জানাননি তিনি।

সংস্কারপন্থীদের দলে ফেরানোর হাইকমান্ডের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চায় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

তিনি বলেন, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই না। এটা নিয়ে মন্তব্য করার কী থাকতে পারে। সারাদেশে দলের সাংগঠনিক বিষয়টি দেখভাল করছে ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহাজাহান।

অতীতের ভুলভ্রান্তি স্বীকার করে যারা দলের প্রতি নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করবে এবং ভবিষ্যতে তারা এই ধরনের ভুল পথে আর হাঁটবে না এই আশ্বাস দেয়াদেরকে দলে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বাকি যারা আছেন তারাও যদি এমনটা করেন, তাহলে তাদের বিষয়ে দলের হাইকমান্ড অবশ্যই বিবেচনা করবেন।

তবে দলটির সূত্র জানায়, যেসব সংস্কারপন্থী নেতা এখনো অন্য দলে যাননি বা র্দীঘদিন ধরে দলের মূল ধারার বাইরে থাকলেও তাদের স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকায় এখনো জনপ্রিয়। তাদের নির্বাচনী এলাকায় এখনো সংস্কারপন্থীদের বাইরে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা সম্ভব হয়নি, এসব নেতাদেরকে আগে দলে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে তিনশ আসনে বিএনপি যাতে দলীয় প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে সংস্কারপন্থীদের দলে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

যাদেরকে দলে ফেরানো হচ্ছে তাদের মধ্যে সাবেক দুই এমপি সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও জহির উদ্দিন স্বপনকে ইতিমধ্যে গুলশান কার্যালয়ে ডেকে কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

এর বাইরে আরো যারা ডাকের অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের মধ্যে সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর, নোয়াখালীর ফজলে আজিম, মুন্সীগঞ্জের শাম্মী শের, এ কে এম আনোয়ারুল হক, শাহরিয়ার আক্তার বুলু, ময়মনসিংহের সাবেক সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন খান দুলু, জয়পুরহাটের আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ারুল কবীর তালুকদার, নেত্রকোনার আবদুল করিম আব্বাসী, মৌলভীবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য এম এম শাহীন, গাইবান্ধার শামীম লিঙ্কন, আশরাফ হোসেন, শাহ আবুল হোসাইন, আলমগীর কবীর, আবু হেনা, মেহেরপুরের আবদুল গণি, নজির হোসেন প্রমুখ।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচিত একটি নাম সংস্কারপন্থী। এই সংস্কারপন্থিদের কারণে এক এগারো সরকারের সময়ে দল দুটিকে বেকায়দার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। দেশের বাঘা বাঘা অনেক নেতা সেদিন এক এগারো সরকারের রাজনৈতিক সংস্কারের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজ দলকে ভেঙ্গে দিয়ে একই নামে আরেকটি দলগঠন করে সেখানে তাদের নাম লিখিয়েছিলেন। বিশেষ করে এই কাজটি করেছিলেন আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির প্রথম সারির নেতারা। বিএনপির তৎকালিন মহাসচিব আবদুল মান্ন ভুইয়া নিজের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে দলের মুল নেতৃত্বের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও বেইমানি করে নাম লিখিয়েছিলেন সংস্কার পন্থিদের খাতায়। বিএনপিকে বিপদে ফেলে তার ডাকে সেদিন সাড়া দিয়েছিলেন তৃণমুল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রায় শতাধিক মন্ত্রী ও এমপি।

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী অনেক নেতাকে দলে ফেরানো হয়। কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে তেমনটা আর হয়নি। দলের মধ্যে প্রবল বাধার মুখে অনেক সংস্কারপন্থী নেতা ফিরতে পারেননি। তবে রাজনৈতিক পটপরির্বতনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিয়ে বিএনপির বর্তমান কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, আবদুস সালামরা দলে ভিড়েন। কিন্তু সেদিন তাদের ডাকে সাড়া দেয়া প্রায় অর্ধশতাধিক সংস্কারপন্থী নেতাদের আর দলে ফেরা হয়নি।

যদিও বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর আগে ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি সংস্কারপন্থী নেতাদের নিয়ে রাজধানীতে একটি বৈঠকও করেছিলেন দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে। ওই বৈঠকে সংস্কারপন্থী নেতারা যাতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেন সেব্যপারে তাদের সহযোগিতা চান। এবং সংস্কারপন্থী নেতাদেরকে আশ্বস্ত করা হয় সময় ও সুযোগ মতো তাদেরকে মূল দলে আবারো ফিরিয়ে নেয়া হবে। সেদিন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কথা রেখেছিলেন সংস্কারপন্থীরা। তাই তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের দেয়া আশ্বাস এবার বাস্তবায়ন করছে বিএনপি। তবে যারা নিজেরা দল গঠন করেছেন বা অন্য দলে চলে গেছেন এমন কাউকে আপাতত দলে ফেরানো হবে না বলে জানিয়েছেন দলটির এক নীতিনির্ধারক।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •