আবু নাঈম মাসুমঃ

কক্সবাজার একটি পর্যটন নির্ভর জেলা। আল্লাহর অসীম দয়া যে, এখানে পৃথিবীর দীর্ঘতম সাগরতট আছে আর বোনাস হিসাবে দিয়েছেন নয়নাভিরাম ঝর্ণাসমেত পাহাড়। ফ্রি হিসাবে দিয়েছেন বাহারি সামুদ্রিক মাছের এক বিশাল ভান্ডার। ফলাফল – পঙ্গপালের মতো পর্যটক। নতুন যোগ হয়েছে মিয়ানমার থেকে আগত “গোলাপী রোমান্স ” খ্যাত ইয়াবা। খালি টাকা আর টাকা। এখানে লবনের মাঠে রাতারাতি আলাদিনের দৈত্যজ্বীন তুলে দেয় প্রাসাদ আর কুঁড়েঘরে ছেঁড়া কাঁথার তলে রেখে যায় টাকা আর টাকা।

যদি এখানে সাগর বা পাহাড় না থাকতো তবে এই জেলা “মংগাপীড়িত জেলা ” খ্যাত রংপুর হয়ে যেত যাদের অনেকে একবেলা খেতে পায় আর দুইবেলা উপোস করে, ভাবুনতো অবস্থাটা!

কক্সবাজারে আড়াই বছর চাকুরী সুবাদে আমি বুঝেছি তারা সেবা নিতেও কোন চক্র বা মাধ্যম ছাড়া এগোতে পারে না তা সে মাতারবাড়ী জমি অধিগ্রহণের কোটি টাকা হোক বা মামুলী একটা ৩৪৫০ টাকার পাসপোর্ট হোক। আমার বিশ্লেষণ মতে প্রতি ১০০ পাসপোর্ট আবেদনকারীদের মধ্যে ৬০ জন অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন তাদের মধ্যে ৪০ জন শিক্ষিত (আনুমানিক) । এদের মধ্যে মাত্র ১০%-১৫% লোক যাবতীয় লেখা নিজে সম্পন্ন করে আসে। বাকীরা কদাচিৎ পাসপোর্ট অফিসে এসে তথ্য জানতে চায়। লক্ষ্য করুন, যাদের জন্য এতো চমৎকার VIP সেবা দেবার সুব্যবস্থাদির আয়োজন করলাম তাদের লাইন ও চেয়ারগুলো বন্ধ্যার মতো শুন্য পড়ে আছে। তবুও বলবেন, পাসপোর্ট অফিসে সেবা পাওয়া যায় না। আমিতো বলবো কক্সবাজারবাসীকে সেবা দিতে চাইলেও তারা সেবা নিতে জানে না। প্রথমেই তারা স্বেচ্ছায় মাধ্যম খোঁজ যা সত্যি দুঃখজনক।

তারা ফ্রিল্যান্সার দালাল কর্তৃক প্ররোচিত হয় যাদের কাজ হলো ১০০ বা ২০০ বা তারও বেশি দর হাঁকায়ে পাসপোর্ট লিখার কাজ করে। তাদের মধ্যে শিক্ষিত শ্রেণীর লোক ও আছে। যেখানে আমার গ্রাহক যেন সরাসরি আমার সেবা পায় তাই আবেদন জমা কক্ষে নিজে অবস্থান করি সেখানে আবেদনকারী কোর্ট বিল্ডিং এ যেখানে ফ্রিল্যান্সার দালালরা আবেদনকারীদের সাথে দর কষাকষিতে ব্যস্ত। স্মার্তব্য,তারা কিন্তু কেউ অফিসে আসে নি, আসতে আগ্রহী ও নয়। আমি কি করে তাদেরকে সেখান থেকে আমার অফিসে আনি? এটা আমি করি ও না কারন, আমার কর্মপরিধিতে তা পড়ে না।

তাই বলে আমিও ছেড়ে কথা বলার পাত্র নই। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করলাম। এক দালাল যদি ১০ জনের ফরম পূরণ করে তবে ২ টাতে ভুল লিখবেই। আমি দালাল কর্তৃক ফরম পুরণ করলে তার ভুল সংশোধনের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করি। উল্লেখ্য, এই জরিমানা শুধু শিক্ষিত জনের জন্য যারা নিজের ইচ্ছায় অন্যের সহায়তা নিয়েছে ও খামখেয়ালি করে প্রথমে অফিসে আসে নি। জরিমানা টাকায় পরিশোধ যোগ্য নয়, গাছ লাগানোর সংখ্যায়।
যেমনঃ ১০ টা সুপারী গাছ লাগানো জরিমানা। ১৫ টা ফলের গাছে বেড়া দেয়া।  ৫ টা কাঠের গাছ রাস্তার ধারে লাগানো।
ইত্যাদি, ইত্যাদি………।

ফলাফলঃ আবেদনকারিদের দালালমুখীতা কমছে, অফিসমুখীতা বাড়ছে। এমন কি, জনমনে পাসপোর্ট অফিসের ইমেজ বাড়াতে যে সব আবেদনকারীরা, যে আবেদনকারীরা নিজের হাতে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন শুধু তাদের বসে সেবা নেয়ার জন্য আলাদা চেয়ার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং সিরিয়ালবিহীন ভাবে তাদের VIP সেবা দেয়া হয়। এমনকি, স্বহস্তে পুরণকারীদের জন্য আলাদা কাউন্টার তৈরী করা হয়েছে, কোটা ব্যবস্থার মতো আরকি ! যোগ্য প্রার্থী না পেলে বয়ষ্ক ও নারীদের বসতে দেয়া হয়। এতে আলোচনা ও সমালোচনা উভয় ই হয়। কিন্তু তাতে আমার কিছুই আসে যায় না।

অনেকে বলে, আপনি না হয় ভালো কিন্তু আপনার সহকর্মীরা তো ভালো না। তাদেরকে বলতে চাই, “আপনি কি বিপথগামী মুসুল্লি দিয়ে ধর্ম বিচার করবেন না কি ধর্ম দিয়ে মুসুল্লি বিচার করবেন? ” আমার সহকর্মীরা আমার মত আন্তরিক বলেই আপনারা সেবা পাচ্ছেন। আমাকে যদি ভালো বলেন তবে তারাও ভালো তা স্বীকার করতে হবে, কেননা তারাই আপনাকে প্রত্যক্ষ সেবা দেয় আর আমি সেবা দেই প্রচ্ছন্নভাবে।
এই যুক্তি ও যদি মন না ভরে, তবে বলবোঃ

আমি জাবালে নূর বা তূর পাহাড় থেকে দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত কোন মহাসাধক নই যে ফুঁকফাঁক দিয়ে আমার চারপাশ কে রাতারাতি বদলে দিতে পারি। নই কোন তামিল ছবির তালপাতা সেপাই মার্কা চেংরা কোন নায়ক যে এক হাতে চলন্ত ট্রেন থামায় আর বাঁচায় লাইনচ্যুতি হতে অতপর নিজ গোঁফে তা দেয়। আমি সাধারণ মানুষ, যে ১০১ ডিগ্রী জ্বর হলে বিছানায় ৩ দিন পড়ে থাকে।

লেখক, সহকারী পরিচালক, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •