cbn  

প্রতিবন্ধীদের কথা তো বিবেচনাতেই নেই !

সৈয়দ শাকিল :
কক্সবাজার পৌরসভা প্রথম শ্রেণীর। শহরের অন্যতম সমস্যা গণশৌচাগার। প্রয়োজনের তুলনায় এখানে গণশৌচাগার নেই। যে শৌচাগার রয়েছে তা ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় জনসাধারণকে।

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে ভালো টয়লেট প্রতিটি মানুষের জন্যই অপরিহার্য। বিষয়টি যতই হাস্যকর মনে হোক, টয়লেটকে এড়িয়ে চলার কোনো সুযোগ কারোরই নেই। বাধ্য হয়ে অনেকে সড়কের পাশে মলমূত্র ত্যাগ করে। এতে নষ্ট হচ্ছে পৌর এলাকার পরিবেশ। এ অবস্থায় শহরে আসা লোকজনকে প্রাকৃতিক প্রয়োজন মেটাতে চরম বিব্রকর অবস্থায় পড়তে হয়।

শহরে প্রায়ই চোখে পড়ে দেয়ালে, ভবনের চিপায় বা ফুটপাথের উপরে মূত্র (প্রস্রাব) ত্যাগ করছে অনেকে। কোথাও কোথাও আবার ফুটপাথের ওপরই মলত্যাগ দেখা যায়। ফলে, ওইসব জায়গা দিয়ে সাধারণ মানুষ চলাচলের সময় চরম বিপত্তিতে পড়ে। মূত্রের প্রকট দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চেপে হাঁটতে হয় পথচারীদের।

প্রশ্ন হচ্ছে, যারা ফুটপাথের ওপর বা রাস্তার পাশে মল-মূত্র ত্যাগ করছে তারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে করছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই বলছেন, নিতান্ত বাধ্য হয়েই রাস্তার পাশে মল-মূত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে। এখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি নেই বলে দাবি তাদের।
বর্তমানে কক্সবাজার উন্নয়নে কাজ করছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এই সমস্যা সমাধানে মাথা ব্যাথা নেই তাদেরও।

পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শহরে পৌরসভার ৬টি পাবলিক টয়লেট রয়েছে। বড় বাজারে রয়েছে একটি, আইবিপি মাঠস্থ একটি, একটি সদর হাসপাতালে, আরেকটি বাস-টার্মিনালস্থ, অন্যটি সী-বীচ সংলগ্ন পাবলিক টয়লেট। ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাসে পৌরসভার কস্তুরা ঘাট সংলগ্ন নির্মিত একটি গণশৌচাগার উদ্বোধন করা হয়। তা উদ্বোধনেই সীমাবদ্ধ। সেদিন থেকে আজ অব্দি তা বন্ধ রয়েছে।

পৌরসভার এই পাবলিক টয়লেট পৌরবাসীর জন্য অতি নগন্য। যে ৫টি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ পরিচালিত চালু রয়েছে তাও চরম অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
এর পরিণতিতে মূত্রনালিতে ইনফেকশন এবং কিডনি সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষত নারীদের বিভিন্ন যৌন সমস্যায় বেশি পড়তে হয়। নারীদের এ ধরনের নাগরিক বিড়ম্বনা নিয়ে যথারীতি উদাসীন কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কক্সবাজার পৌরসভার মোট জনসংখ্যা দুই লাখের অধিক। বসবাসরত এবং জরুরি প্রয়োজনে শহরে আসা মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখের বেশি মানুষের সমাগম হলেও এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট তো নেই বললেই চলে।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ প্রতিদিন মলমূত্র ত্যাগের প্রয়োজন হলে তাদের অনেককেই পড়তে হচ্ছে তীব্র যন্ত্রনায়।
পুরুষরা কোনোমতো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে পারলেও নারীদের পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়। প্রতিবন্ধীদের কথা তো বিবেচনাতেই নেয়া হয়নি এক্ষেত্রে। বাসা থেকে কাজে বের হয়ে আবার ফিরে না আসা পর্যন্ত প্রস্রাব-পায়খানা চেপে রাখতে হয় নারী-প্রতিবন্ধীদের।

এ অবস্থায় শহরে নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব, আধুনিক, মানসম্মত ও পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
শহরে ফুটপাতে অবস্থানকারী, ভাসমান মানুষ, ফকির, পাগল, ভবঘুরে, কুলি-মজুর, রিকশাচালকদের অনেকেই রাতের আঁধারে খোলা স্থানে এ কাজটি করছে। ফলে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই শহরের অন্তত ১০টি নতুন গণশৌচাগার নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করায় নগরবাসী নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে বলে দাবি পরিবেশবিদদের।
সৈকতে বেড়াতে এসে শ্রাবন্তি নামে এক নারী পর্যটক বলেন, ‘বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত এলাকা হিসেবে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য গণশৌচাগার ব্যবস্থা অতি স্বল্প। যা সত্যিই বেমানান। প্রাকৃতিক ডাক যা মুহুর্তের মধ্যেই সেরে ফেলতে হয় তার ব্যবস্থার কোন উন্নতি নেই। পর্য টন শহর হিসেবে এই ব্যবস্থার উন্নতি হওয়া দরকার।

শহরের বড় বাজার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, শহরের সব চেয়ে বড় এই বাজার। এখানে প্রতিদিন স্থানীয়রা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাজার করতে আসে। বিশাল বাজারে দোকানদারও ও ব্যবসায়ী কম নয়। বাজারের এই পাবলিক টয়লেট যথেষ্ট নয়। তাছাড়া রক্ষনাবেক্ষন নেই।

বাস-টার্মিনাল এলাকার জহির আহাম্মেদ নামে এক যাত্রী বলেন, ‘বাস-টার্মিনালস্থ পৌর গণশৌচাগারের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা। এখানে টার্মিনাল এলাকার শ্রমিক কিংবা স্থানীয়দের দখলে থাকে। যার কারণে অনেক যাত্রীই দরকারি কাজ সারাতে পারেন না।জোড়াতালির মাধ্যমে চালানো হচ্ছে শৌচাগারটি।

আইনজীবী একরামুল হুদা জানান, আদালত চত্বর সহ পৌরশহরে প্রতিদিন বিপুল পরিমান লোকের সমাগম ঘটে, কিন্তু সরকারি জায়গা থাকা সত্ত্বেও এখানে কোন গণশৌচাগার নেই। নতুন মেয়রের কাছে দাবি- সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করে গণশৌচাগার নির্মাণ করা হোক।

জেলাবাসীর অর্ধেক নারী হলেও তাদের জন্য পৃথক কোনো টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। নারীদের প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বও নেই।
শহরের বেসরকারি চাকরিজীবী নারী হামিদা খাতুন বলেন, নারীদের জন্য টয়লেট সমস্যা আরও বেশি। নারী বান্ধব পাবলিক টয়লেট না থাকায় বাড়ী থেকে বাহির হওয়ার সময় পানি কম খেয়ে আসি। যাতে রাস্তায় প্রাকৃতিক ডাক কম আসে। পর্যাপ্ত পানি পান না করায় শাররিক অনেক সমস্যায় ভুগতে হয়। মলমূত্র ত্যাগের জন্য অনেক নারী কাজ ফেলে বাড়িতে ফিরে যেতে হয়।
মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য কর্মস্থলে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ টয়লেট ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। টয়লেটের অপর্যাপ্ততার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ বিভিন্ন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছে।

শহর পরিষ্কার রাখতে হলে শহরবাসীকে যেমন দায়িত্বশীল হতে হয়, তেমনই পৌরসভাকেও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হয়। প্রয়োজনীয় স্থানগুলোতে গণশৌচাগার প্রয়োজন।

এবিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার সচিব রাসেল চৌধুরী বলেন, কস্তুরা ঘাট এলাকায় নির্মিত গণশৌচাগারটি কেউ লীজ না নেওয়ায় লীজ দেওয়া যাচ্ছে না। কক্সবাজার পৌরসভায় নতুন গণশৌচাগার করার পরিকল্পনা নেই। এ বিষয়ে মেয়র সাহেব জানেন।

ডাঃ আশীষ বলেন, মস্তিষ্কে সংকেত এল টয়লেটে যাওয়া দরকার। দীর্ঘক্ষণ প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে না পারলে শরীরে স্থায়ী বা অস্থায়ী নানা ধরনের রোগ জন্ম নেয়। নোরাং টয়লেট বা কমোড ব্যবহার করলে ইউরিন ইনফেকশন ও কিডনি সমস্যা হয়। এছাড়া দীর্ঘ সময় প্রস্রাব চেপে রাখার কারণেও এ ধরনের সমস্যা হয়। এতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায় বলেও জানান তিনি।
পরিবেশবিদ বিশ্বজিৎ সেন বাঞ্চু বলেন, শহরের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য পরিবেশবান্ধব টয়লেট ব্যবস্থার অত্যান্ত জরুরী। খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগে এতে তীব্র গন্ধে পরিবেশ দূষণসহ জনস্বাস্থ্য নানা ধরনের ঝুঁকিতে পড়ছে । পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের ক্ষতি করছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে শহরের সৌন্দর্যও। এছাড়াও গৃহস্থালি বর্জ্যরে পাশাপাশি হাসপাতালের বর্জ্যও যেখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র মুজিবুর রহমান বলেন, পৌর শহরে পাবলিক টয়লেটের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। আমি গণশৌচাগার প্রকল্পে হাত দিয়েছি। প্রথমে সৈকত এলাকায় ৪টি পাবলিক টয়লেট হবে। ক্রমান্বয়ে শহরে আরো কিছু গণশৌচাগার করার ইচ্ছা আমার রয়েছে।

যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করায় পবিত্রতা নষ্ট হয়। একটি আদর্শ শহরে পর্যাপ্ত সংখ্যক পাবলিক টয়লেট থাকা জরুরী। মানবিক কারণেই কর্তৃপক্ষকে এ সমস্যা সমাধানে সক্রিয় হতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •