cbn  

লায়ন লোকপ্রিয় বড়ুয়া

বিশ্ব মানবতাবাদী মহামানব গৌতম বুদ্ধ স্বীয় মেধা, প্রজ্ঞা এবং বোধিজ্ঞান লাভের মাধ্যমে মহামূল্যবান বৌদ্ধ দশ’ন পৃথিবীর মানুষের জন্য রেখে গেছেন। আষাঢ়ী পূণি’মা হতে আশ্বিনী পূণি’মা বৌদ্ধদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূন’ সময়। দীঘ’ তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুগন এবং গৃহী সমাজ কঠোর ব্রত, সংযম তথা শীল পালন করে নিজেদের জীবনকে অনেক উন্নত করেন। এই সময়টি বৌদ্ধ নর-নারী ও বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিক্ষুনীদের জন্য ব্রত বা শীল পালনের জন্য খুবই গুরুত্বপূন’ সময়। তিনটি মাস ধরে বৌদ্ধ ভিক্ষুগন যে কঠোর ব্রত পালন করেন তারপরই আসে বহুল প্রতিক্ষিত প্রবারণা পূণি’মা। । উল্লেখ্য যে, ব্রত রক্ষা এবং সমাপন, ভিক্ষুগনের আপত্তি দেশনা, ধমী’য় শিক্ষা সমাপ্তি, ধ্যান সমাধি চচ্চার সমাপন, আত্ম সংযম, আত্ম জিজ্ঞাসা, আত্মশুদ্ধি ও দোষ-ত্রুটি স্বীকার ইত্যাদি বিষয়গুলো বিগত তিনমাসের মূল চচা’র অংশ। কুশল কমে’র সংশ্রবে থেকে যত অকুশল আপনার মাঝে হাজির হবে তা বজ’ন করা। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুগন জ্ঞাতে অজ্ঞাতে নিজের সাংঘিক জীবন পালনের সময়ে যদি কোন অকুশল বা বিনয় বিরোধী কাজ করে থাকেন তাহলে তারা এক ভিক্ষু অপর বয়োজ্যেষ্ট ভিক্ষুর নিকট ক্ষমা প্রাথ’না পূব’ক নিজেদের পরিশুদ্ধ করার জন্য বিশেষ বচন পাঠ ও গ্রহন করেন যা প্রবারণার বিশেষ অংশ। গৌতম বুদ্ধ তার প্রিয় ভিক্ষু গনকে নিদে’শ প্রদান করেছিলে যেন প্রবারণার পরের দিন হতে বহুজনের হিত ও সূখের জন্য দিকে দিকে তার আদেশিত দশ’ন প্রচারে মনোনিবেশ করেন। তাই মাননীয় ভিক্ষুসংঘগন সংঘবদ্ধভাবে মাসব্যাপী বুদ্ধ নিদে’শিত বাণী ও বৌদ্ধ দশ’ন প্রচারে বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রামে ছুটে যান। মানব সমাজে এবং প্রানীকূলের যাতে কল্যান সাধিত হয় সেভাবে গুরুত্বপূন’ দেশনা (উপদেশ) প্রদান করেন।

বিশ্বের অন্যান্য বৌদ্ধপ্রধান দেশে ও আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৌদ্ধ সম্প্রদায় অত্যন্ত জাকজমকপূন’ পরিবেশে পবিত্র প্রবারণা উৎসব উদযাপিত হয়। অত্যন্ত আনন্দ ও শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হয় এই পবিত্র দিনে। কাক ডাকা ভোরে পরিবারের সবাই ঘুম থেকে উঠে স্নান কম’ সেড়ে প্রাথ’নায় মনোনিবেশ করে। মূল প্রাথ’না পব’টি পরিচালিত হয় বৌদ্ধ বিহার বা প্যাগোডাতে। প্রাথ’নার পাশা-পাশি শীল পালন, দূপুর বারটার আগে আহার গ্রহন, আলোচনা সভা, সেমিনার ইত্যাদিতে অংশগ্রহন করা বেশ সূখকর। দিবসের শেষে আসে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে শুরু হয় আকাশ প্রদীপ ও ফানুস উড়ানোর মিলনমেলা। এই মিলনমেলা প্রবারণা উৎসব কে আলিঙ্গন করে সাব’জনীনতায়। ধম’ যার যার উৎসব সবার। সন্ধ্যাকাশে অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারনা ঘটে, কি সেই দৃশ্য? বৌদ্ধ পরিবারের ছেলেরা অনেক কষ্ট করে বিপুল সংখ্যক ফানুসবাতি বানায় এবং খোলা আকাশপানে এই ফানুসগুলি উড়াতে থাকে। ফানুসের রক্তিম আভা উধা’কাশে বিচিত্র রূপে আলো ছড়ায় যা সবার মনে প্রফুল্ল এনে দেয়। মধ্যরাত পয’ন্ত শিশু, কিশোর,যুব এবং বিভিন্ন বয়সের নর-নারীরা এই আনন্দেকে উপভোগ করেন। ইদানিং এই মাত্রাকে আরও আকষ’নীয় করার লক্ষ্যে নানা রঙের আতশবাজিও পোড়ায়। ফানুস বানাতে চিনাকাগজ, বাঁশের তৈরী চাকা (প্রমান সাইজ), তারের রিং এবং মোমের বিশেষ সলিতা প্রয়োজন।

এই ফানুসের প্রচলন কিভাবে হয়েছিল তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল; গৌতম বুদ্ধ গৃহত্যাগের পর অনোমা নদীর তীরে সত্যক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের ইচ্ছাশক্তি পুরণ হবে কিনা তা দেখার জন্য নিজের তরবারি দিয়ে মাথার একগুচ্ছ চুল কেটে উদ্ধাকাশে ছুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি মনস্থির করেছিলেন যদি বোধিজ্ঞান লাভ করতে পারেন তাহলে এই ছুলের গোছা কখনই নিম্নগামী হবেনা, বুদ্ধ বাস্তবিক দেখলেন ঐ চুলের গোছা আর নিম্নদিকে না পড়ে উধা’কাশেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় থেকেই বৌদ্ধরা ধারনা করে এসেছেন যে, বুদ্ধের চুলের গোছা স্বগে’র “চুল্যমনি চৈত” তে সংরক্ষিত রয়েছে। আর সেই থেকেই চুল্যমনি চৈতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মানসে আকাশে প্রদীপ জ্বালানো এবং ফানুস উড়ানোর প্রচলন শুরু হয়। রঙ বেরঙের হাজারো ফানুস উধ্বা’কাশে তারার মত জ্বলতে থাকে পুরো আকাশ জুড়ে। কী দারুন মহিমা ছড়ায় তা বাড়ীর ছাদে বা খোলা মাঠে সবার সাথে দেখার পরিবেশটাই মানুষের মনে অনেক প্রশান্তি দেয়। সৌভাতৃ্ত্বের বন্ধনে সিক্ত হয়ে সবাই অপার আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে। এই ফানুস উড়ানো যে কত আনন্দ মধুর তা শিশু, কিশোর ও যুবক যুবতীদের উল্লাসের মাত্রাটি উপভোগ না করলে বুজতেই পারবেননা।

আপসোস! যুগে যুগে মানুষের ভূলের কারনেই অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমাদের শান্তি ও সৌভাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করতে চেয়েছিল। এই স্বাধীন সাব’ভৌম বাংলাদেশে বিগত দু’বছর আগে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি করেছিল কতিপয় স্বাথা’ন্বেষী মহল এবং জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল রামু, উখিয়া ও কক্সবাজারে অনেক বুদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ গ্রাম। চিরতরে হারাতে হয়েছে শত শত বছরের পুরানো বুদ্ধ মূত্তি, পুথি, দূল’ভ বৌদ্ধ দশ’নের বই পুস্তক এবং সেগুন কাঠের তৈরী বিভিন্ন প্যাগোডা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট ভূমিকাতে সেই সময়ে আরও বড় অঘটন থেকে রক্ষা পেয়েছিল এদেশের গোটা বৌদ্ধ সম্প্রদায়। গেল বছরও আমাদের পাশ্ববত্তী দেশ মিয়ানমার এর রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্টি সেদশের সেনা পুলিশের হাতে অমানুষিক নিযা’তন সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশের উখিয়া, রামু ও কক্সবাজার এলাকায় শরনাথী’ হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তখনো সাথে সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুগান্তকারী অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরনাথী’কে এদেশে থাকার আশ্রয় দিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূত্তিকে অনেক উধে’ তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন। একটি মহল এই বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরী করতে চেয়েছিল। কিন্তু বত’মান স্বাধীনতাপক্ষের সরকারের বিশেষ তদারকিতে অশুভ চক্রের নীল নকশা ভন্ডুল হয়েছিল। অথচ, শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় সেই সময়টিতে মিয়ানমার সরকারের বিরূদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপন করে মানব বন্ধন করেছিল এবং বিবৃতি দিয়েছিল। এখনো আমাদের দাবী যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজস্ব রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আসুন এই পবিত্র প্রবারণা পূণি’মা দিনে বাংলাদেশে বসবাসকারী বৌদ্ধরা নূতন করে শপথ নেই; বুদ্ধের অহিংস শান্তি বাণী প্রচার করে বিশ্ব মানব কল্যাণে আমরা একতাবদ্ধ হই। সমস্ত সংকীন’তা পরিহার করে দল, কূল, নিকায়ের বেড়াজাল উৎপাটন করে দেশে বিদেশে আমাদের ভাবমূত্তি’ উজ্জ্বল করি। দেশের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে শান্তি ও সৌহাদ’পূন’ সম্পক’ স্থাপন করি। শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ জাতি হিসেবে পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গলের জন্য নিজেদের সেরা কাজটি উপহার দিতে চেষ্টা করি।

________________________________________________________________________________
লেখকঃ শান্তি কমী, সংগঠক ও প্রাবন্ধিক। ই-মেইলঃ barualpb@yahoo.com তারিখঃ ৪ অক্টোবর, ২০১৮।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •