cbn  

ইমাম খাইর, সিবিএন:
উখিয়ার কুতুপালং এলাকায় অবস্থানরত ১০১ হিন্দু রোহিঙ্গা পরিবারে পালিত হচ্ছে দুর্গোৎসব। তাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে উপহারসামগ্রী। এসব উপহার ইতোমধ্যে তাদের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিতরণ করা হয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার ঘটনায় সেখান থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু রোহিঙ্গারা গত বছর দুর্গোৎসব পালন করতে না পারলেও এ বছরই মূলতঃ তাদের সে সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।
এই দুর্গোৎসবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রাণের পাশাপাশি শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে নতুন কাপড়সহ নানা সামগ্রী পাঠিয়েছেন হিন্দু রোহিঙ্গাদের জন্য। পূজার যাবতীয় আয়োজন ও শুভেচ্ছা উপহার পেয়ে আনন্দিত তারা। একই সঙ্গে নির্ভয়ে পূজা উদযাপনে কক্সবাজার জেলা পুলিশ বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করায় স্বাচ্ছন্দ্যে দুর্গোৎসব পালন করছেন তারা।
কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘দুর্গোৎসবে হিন্দু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। অন্যান্য ক্যম্পের তুলনায় হিন্দু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কয়েক গুণ বেশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং টিম রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছেন।’
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আরাকানি হিন্দুদের জন্য পূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা উপহার পাঠিয়েছেন। মঙ্গলবার থেকে আমরা বিতরণ শুরু করেছি।’
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি এডভোকেট রনজিত দাশ বলেন, ‘কুতুপালং এলাকায় অবস্থান নেয়া ১০১ পরিবারের প্রায় সাড়ে ৪শ হিন্দু রোহিঙ্গা পূজায় অংশ নিবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবধরণের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। আমরা তাতে সন্তুষ্ঠ।’ তিনি বলেন, দূর্গোৎসব হলেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিসর্জনের জায়গা নেই। তাই বিজয়া দশমীর দিন আমরা আলাদা পরিবহনে করে প্রতিমাসমূহ কক্সবাজার এনে বিসর্জনের ব্যবস্থা করছি।’
গত বছরের ২৫ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংস ঘটনার পর মুসলিম রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১৬৫ পরিবারের ৫২৩ জন হিন্দু রোহিঙ্গা। এরমধ্যে ৬ পরিবারের ২৭ জন হিন্দু ফের মিয়ানমারের পালিয়ে গেলেও ৪৯৬ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে বিশেষ নিরাপত্তায় রাখে বাংলাদেশ সরকার। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব হিন্দু রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাসহ নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় এবারের দুর্গোৎসবেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিমা বিসর্জনের যাবতীয় সুযোগ সুবিধাসহ এই দুর্গোৎসবে তিনি ত্রাণের পাশাপাশি শুভেচ্ছা উপহারও পাঠিয়েছেন। এতদিন রাখাইনে ছোট পরিসরে হিন্দু রোহিঙ্গারা দুর্গাপূজা উদযাপন করলেও এবার বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে দুর্গোৎসব পালনে সুযোগ পাওয়ায় আনন্দিত তারা।
উখিয়ার কুতুপালং হিন্দু রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত সোনা বালা রুদ্র (৫৫) বলেন, আজ এক বছর দেড় মাস এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছি। এই পর্যন্ত আমার কোনও সমস্যা হয়নি। মিয়ানমার থেকে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসার পর থেকে চাল, ডাল, তেল ও নানা ত্রাণ সামগ্রী পেয়ে আসছি। সর্বশেষ পেলাম বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার। এতে আমি খুব আনন্দিত। কারণ, প্রতি বছর মিয়ানমারের ছোট পরিসরে আমরা দুর্গাপূজা পালন করে আসছিলাম। আজ নিজ জন্মভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে এসে আরও বৃহৎ আকারে দুর্গোৎসবে সামিল হতে পেরেছি। এজন্য বাংলাদেশে সরকারকে আর্শিবাদ জানাচ্ছি।
সোমা পাল (৫০) নামের এক হিন্দু রোহিঙ্গা বলেন, প্রাণ ভয়ে নিজ জন্মভূমি মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে এসে এভাবে সম্মান পাবো, কল্পনাও করতে পারিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে শুভেচ্ছা উপহার পাঠিয়েছেন এতেই আমরা আনন্দিত। তবে, এই দুর্গোৎসবে আমার প্রার্থনা থাকবে, আমরা যেন নিরাপদে আমাদের দেশে ফিরে যেতে পারি। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের আরও সহযোগিতা চাই।’
পূজা ম-পে দায়িত্বরত নিরঞ্জন রুদ্র (৪৫) বলেন, ‘গত বছর ২৫ আগস্ট রাখাইনে সন্ত্রাসী হামলার পর আমরা বাংলাদেশে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসি। সেই বছর কোনও পূজা করতে পারিনি। কিন্তু এ বছর বাংলাদেশ সরকার আমাদের দুর্গোৎসব পালনের সুযোগ দেওয়ায় আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা ক্যাম্পের ভেতর থাকলেও যেন নিজ দেশে বসবাস করছি। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মনে রাখার মতো। আমাদের কোনও ধরনের সমস্যা নেই।’
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান বলেন, ‘আপনারা জানেন যে মিয়ানমার থেকে শুধুমাত্র মুসলিম রোহিঙ্গারা নন, সঙ্গে বেশ কিছু হিন্দু রোহিঙ্গারাও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আমরা তাদের কুতুপালং এলাকায় একটি ক্যাম্প করে সার্বিক নিরাপত্তাসহ নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে আসছি। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবাইকে আশ্রয় দিয়েছেন। এ কারণে দুর্গোৎসবে যাতে হিন্দু রোহিঙ্গারা আনন্দের সঙ্গে দুর্গাপূজা পালন করতে পারে সেজন্য ক্যাম্পের অভ্যন্তরে পূজাপ-প থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
এদিকে, ১৬ অক্টোবর মঙ্গলবার বিকালে হিন্দু রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্পে স্থাপিত পূজা মন্ডপ পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন, জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি এড. রঞ্জিত দাশ, এডিএম আশরাফুল আবসার, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান, রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী। তারা পূজা মন্ডপ পরিদর্শন শেষে হিন্দু শরণার্থীদের সাথে মতবিনিময় করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •