সন্দেহ

প্রকাশ: ৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০৪:১৯ , আপডেট: ৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০৪:৪৫

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে



ইমরান হোসেন মুন্না


আমি বারান্দায় দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। সিগারেট খাওয়া আমার অভ্যাস না,যখন কিছু নিয়ে বেশি চিন্তা করি বা টেনশনে থাকি তখন দু একটা সিগারেট খাই। বার বার ফোন বেজেই যাচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি অবন্তি ফোন দিচ্ছে। ইচ্ছা করেই ফোন টা ধরছি না। ওর ওপর রাগ লাগছে,ঘৃণা হচ্ছে। ও,হ্যা পরিচয় টাই তো দেয়া হলো না। আমি ফারাবী আদনান নীল। আর অবন্তি আমার স্ত্রী।

আমার আর অবন্তির অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। অবন্তিকে যেদিন দেখতে যাই, ওকে দেখে একটু অবাক হয়ে যাই কেনোনা আমি এ পর্যন্ত কাজিনদের জন্য মেয়ে দেখতে যতবার গিয়েছি,সবাই মেকাপ করা,সাজুগুজু করা, শাড়ি পড়া কিন্তু অবন্তি না তো সাজ-সজ্জা করেছে আর না শাড়ি

পড়েছে। একটা সাদা- কমলা রঙের সালোয়ার কামিজ পড়েছে। একদম সাদা সিধা। প্রথম দেখাতেই অবন্তিকে ভালো লেগে গেলো। অবন্তির সাথে যখন আলাদা ভাবে কথা বলতে ওর রুমের বেলকুনিতে গেলাম,অবন্তিই প্রথমে কথা শুরু করলো।

—ফারাবী, আপনি কিছু বলেন তার আগে আমি কিছু বলতে চাই কেনোনা যেকোনো সম্পর্কের শুরুতে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন।

আমি ভাবছিলাম অবন্তি কি এমন বলতে চায়?

—আসলে ফারাবী আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে আমি আমার ক্লাসমেটের সাথে রিলেশনে জড়িয়ে যাই। প্রথমদিকে আমাদের সম্পর্ক টা খুব ভালো ছিলো। একসাথে ক্লাস করা,এক সাথে লেখাপড়া করা,একসাথে আড্ডা দেয়া। সময়টা অনেক সুন্দরভাবে কাটছিলো। হঠাৎ করে তন্ময় বদলে গেলো। আমার সাথে আগের মতো কথা বলতো না,ফোন রিসিভ

করতো না। আমি একদিন ওরে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম আমার ভুল কোথায়? কেনো এমন করছে। ও সোজাসুজি উত্তর দিলো, “এতোদিনের বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা,তুমি আমায় তোমার হাতটা ধরতে দাও না,আমায় ছুঁতে দেওনা,তোমায় আদর করতে দাও না । আমার ইচ্ছার কি কোনো দাম নেই? এখনকার সম্পর্কে এসব কমন,আর তুমি ব্যাক

ডেটেড মেয়েদের মতো রিয়াক্ট কেনো করছো?” আমি তন্ময়ের কথা শুনে চমকে গেলাম। কি বলছে ও। ও তো ভালো করেই জানে আমি কেমন আর ওর লজ্জা করলো না এভাবে আমায় বলতে। আমি ওকে বুঝালাম কিন্তু ওর একই কথা। বাধ্য হয়ে সম্পর্ক ভেঙে দেই। এমন ভালোবাসার দরকার নেই যেখানে মনের থেকে দৈহিক ভালোবাসার চাহিদা বেশি।

আপনি হয়ত ভাবছেন আপনাকে এগুলি কেনো বললাম? আসলে আপনাকে এগুলি বলবার কারণ হলো আপনি হ্যা বা না বলার আগে আমার সম্পর্কে সম্পূর্ণ জেনেই যেনো ডিসিশন নেন।

অবন্তির সত্যবাদীতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম,খুব কম মানুষেরই নিজের অতীত অন্যকে জানানোর সাহস রাখে। অবন্তির সব কিছুতেই আমি মুগ্ধ দর্শক ছিলাম। হয়ত প্রথম দেখাতেই মনের মাঝে ওর জন্য আলাদা জায়গা তৈরী হয়ে গিয়েছিলো। আমি ঠিক করেছিলাম বিয়ে করলে আমি অবন্তিকেই বিয়ে করবো।

এরপর আমার আর অবন্তির বিয়ে হয়ে গেলো। নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হয় যে অবন্তির মতো লাইফ পার্টনার পেয়েছি। রোজ ভোরে ও আমায় ডেকে তুলে,তারপর দুজন এক সাথে নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে ও গিয়ে আমার জন্য নাস্তা তৈরী করে। অফিসে কি পড়ে যাবো,না পড়ে যাবো,সব ওই ঠিক করে দেয়।

অবন্তি সব সময় আমার শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতো আর টাই টাও ওই পড়িয়ে দিতো। ওকে টাই না পড়াতে দিলে রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। তখন ওর অভিমান ভাঙাতে আমার কান ধরে উঠবস করতে হতো। সারাটি দিন বার বার ফোন দিতো,ঠিক মতো খেয়েছি কি না

,নামায পড়েছি কি না। অফিস থেকে ফেরার পথে কোনো কোনোদিন ওর জন্য সাদা গোলাপ বা বকুল ফুলের মালা বা চকোলেট নিয়ে যেতাম। এগুলি পেয়ে আমার পাগলি বউটা অনেক খুশি হয়ে যেতো।

সময় টা বড় স্বার্থপর, কারো ভালো থাকা দেখতে পারে না। দুটা বছর খুব সুন্দরভাবে কাটলো, কিন্তু এরপরই আমার জীবনে ঝড় নেমে এলো।

অবন্তিকে কিছুদিন হলো আর আগের মতো চঞ্চল মনে হচ্ছিলো না। কেমন যেনো চুপচাপ থাকতো,কথা কম বলতো। আমি জানতে চাইলে ও উত্তর দিতো,তুমি বেশি ভাবো আমি ঠিক আছি। খেয়াল করলাম লুকিয়ে কার সাথে যেনো কথা বলে। আমি সন্দেহ করতে চাইনি কিন্তু ওর প্রত্যেকটা আচরণ ওর ওপর সন্দেহ

করতে আমায় বাধ্য করছিলো। সেদিন ও রান্নাঘরে কাজ করছিলো। অবন্তির ফোন বার বার বেজে যাচ্ছিলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি তন্ময় কল করেছে।
আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। আমার সন্দেহই ঠিক ছিলো। আমি ভেবেছিলাম অবন্তি আমায় ভালোবাসে কিন্তু ও তো… না আর ভাবতে পারছি না।

অবন্তিকে কিছু না বলে বাহিরে চলে এলাম। আজ অফিস থেকে  বাসায় এসে দেখি বাসার দরজা সম্পূর্ণ খোলা। আমি অবাক হয়ে যাই কেনোনা অবন্তি কখনো দরজা খোলা রাখে না। ঘরে ঢুকতেই দেখি,একটা ছেলে অবন্তিকে দেয়ালের সাথে আটকিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। এটা দেখে মাথায় রক্ত উঠে যায়। দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে টেনে মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেই।

অবন্তি কেঁদে আমায় কিছু বলতে চাইলে আমি ওর গালে থাপ্পড় লাগিয়ে দেই,ওকে এই মুহূর্তে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলি। ওর মতো দুশ্চরিত্রা মেয়ের সাথে এক ঘরে থাকা সম্ভব নয়। অবন্তি আমার পা জড়িয়ে ধরে বার বার ওর কথা শুনতে

বলছিলো কিন্তু আমি ওর একটা কথাও শুনলাম না। জোড় করে বাসা থেকে বের করে দিলাম। মেয়টা দরজার কাছে দাড়িয়ে কান্না করলো কিন্তু আমার মন গললো না। মেয়েটাকে এক সময় যেতে দেখলাম। এক ফোঁটাও মায়া কাজ করছে না,ঘৃণা হচ্ছে।

অবন্তির ফোন বার বার বেজেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে পুরুষ মানুষের কণ্ঠ। আমি ভেবেছি তন্ময় ফোন করেছে। অবন্তির ওপর ঘৃণার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আমি ফোন কাটতে নিবো এমন সময় লোকটা বললো সে ধানমন্ডি থানার ইন্সপেক্টর বলছে।

ইন্সপেক্টরের ফোন পেয়ে একটু চমকে গেলাম। ফোন করার কারণ জানতে চাইলে সে বললো—অবন্তি হাসপাতালে। আমায় এই মুহূর্তে বারডেম হাসপাতালে আসতে বললো।

আমি দৌড়ে একটা অটো ঠিক করে বারডেম হাসপাতালে পৌঁছালাম। পুলিশের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। জানতে পারলাম,অবন্তি রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো। কোথা থেকে একটা ছেলে এসে বাইক নিয়ে ওর রাস্তা

আটকায়। অবন্তির হাত টানা টানি করে। অবন্তি এক পর্যায়ে ছেলেটাকে ধাক্কা দেয়। ওদের মাঝে কি কথা হয়,দূর থেকে ওখানকার মানুষগুলি বুঝতে পারেনি। অবন্তি কে সাহায্যের জন্য যেতে নিবে,দেখে ছেলেটা মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে টেনে একটা চলন্ত বাসের সামনে ধাক্কা দেয়।

ইন্সপেক্টরের কথা শুনে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো। কর্তব্যরত ডাক্তারের থেকে জানতে পারলাম অবন্তির অবস্থা ভালো না। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটার ওপর ঘৃণা জন্ম নিয়েছিলো তার জন্য এখন কাঁদছি। পুলিশ সান্তনা দিয়ে বললো–

-প্রতক্ষ দর্শনকারীদের মতে ঘটনা টা অ্যাটেম টু মার্ডারের। উনারা ওই ছেলেটাকেও ধরতে সক্ষম হয়েছে। ছেলেটা গণপিটুনি খেয়ে এখন এই হাসপাতালেই প্রাথমিক চিকিৎসাধীন আছে।

আমি বুঝতে পারছিলাম না যে অবন্তিকে কেউ কেনো মারতে চাইবে। পুলিশ অপরাধীর কাছে আমায় নিয়ে গেলো।
আমি কেবিনে ঢুকতেই চমকে গেলাম। আমার সামনে তন্ময়। নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারলাম না। দৌড়ে গিয়ে ওর শার্টের কলার ধরে মুখে দু তিনটা মেরে দিলাম। ওর থেকে জানতে চাইলাম যে কেনো অবন্তিকে মারার চেষ্টা করেছে? আমি মনে মনে ভাবছিলাম অবন্তির সাথে ওর সম্পর্ক কিন্তু এই ছেলে কেনো ওরে মারতে চাইবে?

তন্ময় বলতে শুরু করলো—অবন্তিকে ছেড়ে দেয়া আমার জীবনের ভুল গুলির মাঝে একটা। ও যে অন্য কাউকে ওর জীবনে জায়গা দেবে জানতাম না। ওকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু পাইনি। এক মাস আগে ওকে মার্কেটে দেখি। এরপর ওর পিঁছু পিঁছু এসে বাড়ি চিনে যাই।

এরপর অবন্তির নাম্বার জোগাড় করে ওরে ফোন দেই। ওরে আমার কাছে চলে আসতে বলি,কিন্তু ও কোনো ভাবেই আমার কাছে ফিরতে রাজি হচ্ছিলো না। ও নাকি তোরেই ভালোবাসে আর তোরে ছাড়া ওর জীবন কল্পনা করতে পারবে না। কিন্তু আমার জীবনে অবন্তিকে আমার চাই তো চাই।

আমি তন্ময়ের কথা শুনে চমকে গেলাম। অবন্তি যদি আমায় ভালোবাসে তাহলে আজ আমি যা দেখলাম,তা কি ছিলো?
আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম
—অবন্তি যদি তোকে ভালো নাই বা বাসতো তাহলে তুই আমার বাড়িতে কি করছিলি?

—ওরে নিতে গিয়েছিলাম কিন্তু আমায় দেখেই দরজা আটকাতে নেয়। আমি ধাক্কা দিয়ে বাসার ভেতর ঢুকে পড়ি। ও দৌড়ে রুম আটকানোর চেষ্টা করে কিন্তু ও আমার কাছে পারবে?
ওর ভাগ্য ভালো ছিলো যে তুই চলে আসছিলি।

এটা বলেই তন্ময় বেহায়ার মতো হাসছিলো। এগুলি শুনে মাথায় রক্ত উঠে গেলো। মেঝেতে ফেলে ইচ্ছামতো পিটাচ্ছিলাম। পুলিশ এসে থামালো।
—তুই অবন্তি রে মারবার চেষ্টা কেন করলি?

—শা** টা রে বাসার বাহিরে হাটা দেখে বুঝলাম তুই বের করে দিয়েছিস। আমি ওরে আমার সাথে আসতে বললাম। ও রাজি হচ্ছিলো না। আমি ওরে বললাম “তুমি যারে ভালোবাসো,সে তো তোমায় ছেড়ে দিয়েছে,তাহলে আমার জীবনে আসতে কি সমস্যা?” ও বললো—” ও তোমায় ভালোবাসে তাছাড়া ও মা হতে চলেছে” আমি বাচ্চা নষ্ট করতে বললাম,ও রাজি হলো না। তাই ও যখন আমার হবে না,ওকে অন্য কারোও হতে দেবো না।

আমার এখন হাত পা কাঁপছে। নিজের ওপর রাগ লাগছে। আমি এটা কি করলাম? একটাবার কেনো অবন্তির কথা শুনলাম না। আজ আমার জন্যই অবন্তি মৃত্যুরর সাথে লড়ছে। ওকে যদি সন্দেহ না করে বিশ্বাস করতাম,ওর কথা শুনতাম,তাহলে হয়তো অবন্তি এখন আমার পাশে থাকতো।

আমি অপারেশন থিয়েটরের বাহিরে। নার্স কে বের হতে দেখে আমার অবন্তি আর বাচ্চার কথা জানতে চাইলাম।

নার্স জানালো অ্যাক্সিডেন্টের কারণে অবন্তির মিসক্যারেজ হয়ে গিয়েছে। অবন্তির অবস্থাও ভালো না।

এটুকু বলে নার্স চলে গেলো। আমি বার বার আল্লাহর কাছে প্রাথনা করছিলাম যেন আল্লাহ আমার অবন্তিকে আমার জীবনে ফিরিয়ে দেয়। আমি আর কখনো ওকে সন্দেহ করবো না। কিন্তু আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম,আমি যে হতভাগা।

কিছুক্ষণ পর ডাক্তার আমায় জানালো,আমার অবন্তি আর বেঁচে নেই। শুধু মাত্র আমার কারণে,আমার সন্দেহের জন্য আমি আমার অবন্তি আর অনাগত বাচ্চাকে হারালাম। একটা বার যদি অবন্তির কথা শুনতাম? কিন্তু নিজের রাগের জন্য সব হারালাম। আসলে মানুষ হারানোর পর ই মূল্য বুঝে। অবন্তিকে হারিয়ে আমিও আজ শুন্য।

বি.দ্র: আমাদের সবার জীবনে বিশ্বাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্ক টেকে না। কোনো সম্পর্কে সন্দেহ আর বিশ্বাস একসাথে থাকতে পারে না। সন্দেহের বদলে বিশ্বাস করতে শিখুন। আমরা চোখে যা দেখি তা সব সময় সত্য হয় না। আর একটা কথা, কখনো কোনো সমস্যায় পড়লে,আপনজন থেকে সমস্যা গুলি লুকাতে হয় না। যে কোনো সমস্যায় অথবা বিপদে নিজের পরিবারকে জানান। এতে আসন্ন বিপদ থেকে পরিবার আপনাকে বাঁচাবে।  ]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  
  •